জহির সাদিক : আমজাদ মাস্টারের বাড়িতে বিশাল খানাপিনার আয়োজন চলছে। আমজাদ মাস্টারের ছোট ছেলে আমি। আমার নাম রায়হান।
গতকাল আমার জীবনে বিশাল একটা ঘটনা ঘটেছে। বহু প্রতীক্ষার পর সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় একটা গেজেট প্রকাশ করেছেন। সেখানে আমার নাম স্পষ্ট লেখা আছে। এবার আমি প্রমোশন পেয়ে এসিস্ট্যান্ট প্রফেসর হয়েছি। আমার পুরো পরিবার ভীষন খুশি। আমার এতোদিনকার স্বপ্ন পূরণ হতে চলেছে।
পেশায় আমি একজন ডাক্তার। হার্টের বিশেষজ্ঞ। ঢাকা শহরের নামকরা এক সরকারি হাসপাতালে চাকরি করি। পনেরো বছর আগে এমবিবিএস, তার ঠিক দুই বছর পর বিসিএস এবং বছর দশেক আগে স্পেশালাইজেশন কমপ্লিট করেছি। যোগ্যতা আছে কিন্তু আমার প্রমোশন হয়নি। কেন হয়নি এই প্রশ্নের উত্তর আমার জানা নেই। যদিও আমার মতো এমন চান্দু হেলথ ডিপার্টমেন্টে ভুরি ভুরি আছে!
আমার ধারনা এদেশে একমাত্র সরকারি হাসপাতালগুলো ছাড়া বাকি সব জায়গাতে সময়মত প্রমোশন দেয়া হয়। আমার স্কুল বন্ধু সোহাগ প্রায় দশ বছর আগে একটা ইউনিভার্সিটির প্রফেসর হয়েছে। আর এক বন্ধু নিলয়, মেডিকেল কলেজে আমার রুমমেট ছিল। সে এখন একটা বেসরকারি মেডিকেল কলেজের ফুল প্রফেসর। যাইহোক ইংরেজিতে একটা প্রবাদ আছে ‘ইটস বেটার লেইট দ্যান নেভার! এটা ভেবেই আজ সারাদিন ধরে শুকরিয়া আদায় করছি।
এতদিন প্রমোশন না হবার কারনে আমার ভিতরে এক ধরনের হতাশা আর অভিমান জমা হয়ে ছিল। আজ সেই চাপা অভিমান ঝরে পড়তে শুরু করেছে। বছর পাঁচেক আগে রাগ করে নিজের কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছিলাম যে এসিস্ট্যান্ট প্রফেসর না হয়ে আমি কোন বিয়েশাদি করব না।
আমার এই কঠিন শপথের কথা আব্বাকেও জানিয়ে দিয়েছিলাম। আব্বা খুব কষ্ট পেয়েছিলেন। এরপর থেকে আব্বা এবং আম্মা অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষায় থাকতেন কবে আমি প্রমোশন পেয়ে এসিস্ট্যান্ট প্রফেসর হবো।
প্রমোশনের খবর শুনে আব্বা আমাকে জলদি বাড়ি যেতে বলেছেন। প্রায় বছর পাঁচেক পর আজ আমি গ্রামের বাড়িতে যাচ্ছি। এক ধরনের শীতল ভালোলাগার অনুভূতি আমাকে ঘিরে ধরে আছে।
আব্বা এবং আম্মা আমার জন্য একটা মেয়ে দেখে রেখেছেন। মেয়ের নাম মুক্তা। আব্বার কলিগ লিয়াকত মাস্টারের ছোট মেয়ে। মেয়ে দেখতে নাকি খুব সুন্দর। তবে আমার সাথে বয়সের পার্থক্যটা একটু বেশি।
একসময় আমার সাথে লিয়াকত কাকার বড় মেয়ে রুপার বিয়ে ঠিকঠাক ছিল। কিন্ত আমার প্রমোশন জনিত জটিলতায় বারবার বিয়েটা আমি পিছিয়ে দিই। কারন আমি ওয়াদা করেছিলেন এসিস্ট্যান্ট প্রফেসর না হয়ে বিয়ে-শাদির মত টপিকস মাথায় আনবো না। শেষমেশ আমার প্রমোশন হবে না ভেবে লিয়াকত কাকা ধৈর্য্য হারিয়ে তার বড় মেয়েকে ভালো পাত্র দেখে বিয়ে দিয়ে দেন। এখন সেই রুপা তিন সন্তানের জননী।
পরে অবশ্য আব্বার পীড়াপীড়িতে লিয়াকত কাকা তার ছোট মেয়েকে আমার সাথে বিয়ে দিতে রাজি হয়েছেন। মুক্তা এবার অনার্স ফার্স্ট ইয়ারে পড়ছে।
বাড়িতে আজই বলে দিয়েছি এখন আমি বিয়েতে রাজি। বিয়ের কথা শুনে আম্মা আমাকে ঝটপট মুক্তার কথা খুলে বললেন। মুক্তা নাকি দেখতে আসলেই খুব সুন্দর।
আম্মার কথা শুনে মুক্তাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে। প্রমোশনের অপেক্ষায় দিন গুনতে গুনতে কখন যে নিজের শরীরটা একটু বেঢপ সাইজের হয়ে গেছে টের পাইনি। আচ্ছা! মুক্তা আমার এই শরীর দেখে পছন্দ করবে তো? যদি বলে যে আপনার মত ভুঁড়িওয়ালা ডাক্তারকে আমি বিয়ে করবো না। তখন আমার কি খুব খারাপ লাগবে??
এদিকে আমার সুসংবাদ শুনে সোহাগও গ্রামে আসছে। পরেরদিন বিকেলে সোহাগকে সাথে নিয়ে আমার হবু শ্বশুর লিয়াকত মাস্টারের বাড়ির দিকে রওনা দিলাম। উদ্দেশ্য মুক্তা কে দেখবো। এর আগে মুক্তাকে কখনো দেখিনি। সেই পুরনো এক গানের মত এখন আমার মধ্যে এক ধরনের অনুভূতি খেলা করছে। তারে আমি চোখে দেখিনি, তার অনেক গল্প শুনেছি, গল্প শুনে একটু একটু.. ব্যাপারটা ভাবতেই বেশ লজ্জা লাগছে!
পথে যেতে যেতে কল্পনাতে মুক্তার চেহারা বারবার ভেসে উঠছে। মন বলছে মাধুরী দীক্ষিত টাইপের কিছু একটা হবে। শেগি করা চুল, সাথে ভুবন ভুলানো হাসি! তার ওই হাসির দিকে আমি হা করে তাকিয়ে থাকব। আহা! জীবনের এই মাঝ বয়সে এসে প্রথম কোন মেয়েকে নিয়ে এত সুন্দর কল্পনা আসছে!
পথিমধ্যে আমার হবু শ্বশুর লিয়াকত মাস্টারের সাথে দেখা।
হবু শ্বশুরকে দেখে আমি লম্বা একটা সালাম ঠুকে দিলাম।
ভদ্রলোক ভ্রু কুঁচকে আমার দিকে অদ্ভুত ভাবে তাকিয়ে আছেন। আমার পা থেকে মাথা পর্যন্ত একবার দেখে নিলেন।
আমাকে বললেন, ভাই সাহেব! আমি তো আপনাকে ঠিক চিনতে পারছি না।
: আংকেল, আমি রায়হান। আমজাদ মাস্টারের ছেলে।
: তুমি কি সেই ডাক্তার…?
: জ্বি আংকেল.. আমি ডাক্তার রায়হান।
: দ্যাখো তো বাবা.. তোমাকে আমি চিনতেই পারছি না.. বয়স হয়েছে তো.. তাছাড়া তোমাকে চিনবোই বা কেমন করে? সেই কবে তোমাকে দেখেছি.. তা প্রায় সাত আট বছর আগে। তোমার শরীরটাও কেমন জানি একটু ফুলে ফেঁপে গেছে.. তা বাবা, তোমার শরীরের এই বেহাল দশা হলো কিভাবে??
হবু শ্বশুরের কথাবার্তা আমার খুব খারাপ লাগছে। মনে হচ্ছে কে যেন আমার সারা শরীরে হাতুড়ি দিয়ে পেটাচ্ছে। মাথা নীচু করে বিড়বিড় করে কি যেন বলছি কিছুই বুঝতে পারছি না।
: ঠিক আছে বাবা.. মন খারাপ করো না.. তোমরা আমার বাড়িতে যাও.. বাজারে একটু কাজ আছে.. কাজটা সেরেই আমি চলে আসবো।
আমার খুব অস্বস্তি লাগছে। ভয়ে ভয়ে হবু শ্বশুর বাড়ির দিকে পা বাড়ালাম। মুক্তাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে। ওকে না দেখে আজ বাড়ি ফিরবো না। আমরা দুজন হবু শ্বশুরের বাড়ির কাছে এসে পড়েছি। হঠাৎ একটা মেয়েকে বাড়ি থেকে বের হতে দেখলাম। সম্ভবত মেয়েটি আমাদের দিকেই হেঁটে আসছে।
সোহাগ বললো, রায়হান! এই তো সেই মুক্তা। আমাদের দিকেই তো আসছে।
হঠাৎ আমার হার্টবিট বেড়ে গেল। আমার স্থুলকার শরীরটা আবেগে কেঁপে কেঁপে উঠছে। বুঝতে পারছি হার্টের ডাক্তারের হার্টবিট এখন তার নিজের কন্ট্রোলে নেই.. অন্য কেউ কন্ট্রোল করছে!
মুক্তা কাছে এসে বন্ধু সোহাগকে চিনতে পারলো।
: সোহাগ ভাইয়া! কেমন আছেন? ঢাকা থেকে কবে আসলেন? ভাবীরা কি সাথে আসছেন?
মেয়েটাকে বেশ চটপটে মনে হচ্ছে। আমার কল্পনার মুক্তার সাথে মোটামুটি মিল আছে। মুখের অবয়ব অনেকটা মাধুরি দীক্ষিতের মত।
সোহাগ বললো, এইতো আজকেই আসছি। অবশ্য তোমার ভাবিরা আসেনি। তা তুমি কেমন আছো? এদিকে কোথায় যাচ্ছ?
: জ্বি ভাইয়া, ভালো। আমার বান্ধবীর বাসাতে যাচ্ছি।
আমাকে দেখিয়ে সোহাগ বললো, ওকে চিনতে পারছো?
: সরি ভাইয়া, এই আংকেলকে তো ঠিকমত চিনলাম না!
: আরে! এ তোমার আংকেল হতে যাবে কেন? এ হলো ডাক্তার রায়হান। আমাদের আমজাদ স্যারের ছেলে। গতকাল প্রমোশন পেয়ে এসিস্ট্যান্ট প্রফেসর হয়েছে।
মুক্তা জিহবায় কামড় দিয়ে বললো, সরি ভাইয়া! আমি চিনতে পারিনি.. আমজাদ আংকেলের ছেলে যে এতটা বয়স্ক এটা বুঝতে পারিনি।
আমার দিকে তাকিয়ে ফিক করে একটা হাসি দিয়ে বললো, সরি আংকেল! আমাকে মাফ করে দিবেন।
সোহাগ এবার ধমকের সুরে বললো, তুমি আবার ওকে আংকেল বলে ডাকছো?
: সরি ভাইয়া! আর হবে না.. এই যে তওবা করলাম.. তওবা.. তওবা!
মিষ্টি রহস্যময় এক হাসি দিয়ে মুক্তা তার বান্ধবীর বাসার দিকে রওনা দিল।
সম্ভবত মেয়েটি আমাদের বিষয়টা জানে। আমাকে তার পছন্দ হয়েছে কিনা ঠিক বুঝতে পারছি না। অবশ্য পছন্দ না হবারই কথা!
যাহোক দুই সপ্তাহ পর আমার বিয়ের দিনতারিখ ঠিক করা হল। কোন এক অজ্ঞাত কারণে মুক্তা বিয়েতে রাজি হযেছে।
আজ আমাদের বিয়ে। বাসর ঘরে মুক্তা বসে আছে। সেদিনকার মতো আজও শরীরটা আবেগে কেঁপে কেঁপে উঠছে। আমি মুক্তার পাশে গিয়ে বসলাম। দুচোখ ভরে চটপটে কিউট ভার্সিটি পড়ুয়া মেয়েটিকে একটু সময় নিয়ে দেখলাম। আজ মুক্তাকে অতিমাত্রায় সুন্দর লাগছে।
জিগ্যেস করলাম, কেমন আছো?
: জ্বি আংকেল! আমি ভালো আছি।।
বলেই জিহবায় কামড় দিয়ে বললো, সরি! আর কোনদিন হবে না!
: সত্যি করে বলোতো.. আমাকে কি তোমার পছন্দ হয়েছে?
: হুম, পছন্দ হয়েছে.. সত্যি বলছি.. তবে আপনার ভুঁড়িটা আমার বেশি পছন্দ.. ছোটবেলা থেকেই ভুঁড়িওয়ালা মানুষ দেখলে ইমোশনাল হয়ে যেতাম.. কেন জানি ভুঁড়িওয়ালা মানুষদেরকে খুব ভালোলাগতো.. মনে হতো ভুঁড়িওয়ালা মানুষেরা কখনও রাগ করতে পারে না.. হয়তো একটু আধটু অভিমান করে.. জানেন! ঋষি কাপুর ছিল আমার প্রিয় নায়ক.. আপনার ভুঁড়ি দেখতে অনেকটা ঋষি কাপুরের মত.. কিউট!
নতুন বউ খিলখিল করে হাসছে। ভুবন ভুলানো সেই হাসি। হাসিটা খুব সুন্দর।
মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েছি এই হাসিতে ডুব দিয়ে আমি আমার গায়ের জমে থাকা চর্বি দ্রুত ঝরিয়ে ফেলবো!
যদিও এই হাসির সত্যিকার কোন অর্থ খুঁজে পাচ্ছি না।
তবে বুঝতে পারছি হাড়বজ্জাত একটা মেয়ে আমার কপালে এসে জুটেছে। এই নিয়েই আমার বাকিটা জীবন পাড়ি দিতে হবে।
নতুন বউয়ের নাক টিপে দিয়ে বললাম, মুরুব্বিদের সাথে কখনও এমন করতে হয়না..!!
লেখা: জহির সাদিক
KMC /91-92