ব্যবহারকারীদের কোনো চাহিদা ছিল না, বস্তুত কোনো ব্যবহারকারীই ছিল না; তারপরও কেনা হয়েছে ১৮ কোটি টাকা দামের ‘ইন্ট্রা অপারেটিভ ইমেজিং সিস্টেম’ মেশিন। তারপর সেগুলোকে পাঠানো হয়েছে একেকটি হাসপাতালে এবং বিভাগ না থাকার কারণে তারা আবার সেগুলো ফেরত নেয়ার অনুরোধ করেছে।
শেষ পর্যন্ত স্বাস্থ্য অধিদফতরের আদেশ পালনের বাধ্যবাধকতার কারণে তিনটি ‘ইন্ট্রা অপারেটিভ ইমেজিং সিস্টেম’ মেশিনের দুটি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও একটি স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করতে বাধ্য হয়। এর আগে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ, সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ ও বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ প্রথমে নেয়ার পর সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও প্রশিক্ষিত জনবল না থাকা এবং অদূর ভবিষ্যতে সংশ্লিষ্ট বিভাগ খোলার পরিকল্পনা না থাকায় মেশিনগুলো ফেরত পাঠায়।
প্রশ্ন হল, কোনো ধরনের চাহিদা, এমনকি প্রয়োজনীয় বিভাগ না থাকার পরও কেন উচ্চ প্রযুক্তির মেশিনগুলো কেনা হল? এর পেছনে ক্রয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের কমিশন সংক্রান্ত কোনো বিষয় রয়েছে কিনা খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেয়ার বিকল্প নেই। কারণ, মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা সরঞ্জাম ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি কেনার ক্ষেত্রে বড় ধরনের অনিয়মের অনেক খবর সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে।
জানা যায়, ২০১২ সালে কেনা মেশিন তিনটি শেষ পর্যন্ত চট্টগ্রাম ও স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে এবং শিগগিরই সেগুলো চালু করার কোনো পরিকল্পনাও নেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূলত বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থায় মেশিনগুলো ব্যবহারের উপযোগিতাও নেই। এমনকি ভারতের দিল্লিতে মাত্র দু-একটি হাসপাতালে এগুলো ব্যবহৃত হয়ে থাকে কার্ডিওভাসকুলার সার্জারি, কার্ডিয়াক সার্জারি বা প্লাস্টিক সার্জনদের চিকিৎসার ক্ষেত্রে। বাংলাদেশে বর্তমানে শেখ হাসিনা বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইন্সটিটিউটে মেশিনগুলো ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। ৮ বছর ধরে অব্যবহৃত পড়ে থাকা মেশিনগুলো দ্রুত ইন্সটিটিউটটিতে স্থানান্তরের পাশাপাশি মেশিনগুলো কেনার পেছনের স্বার্থান্বেষী মহলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া দরকার, যাতে করে ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ মেডিকেল কেনাকাটায় অনিয়মকারীরা সতর্ক হয়।
দেশে অনিয়ম-দুর্নীতির অন্যতম খাত হচ্ছে সরকারি কেনাকাটায় অনিয়ম। এর মধ্যে মেডিকেল সরঞ্জাম কেনাকাটায় অনিয়ম বেশি হয় বলেই মনে হচ্ছে। স্বাস্থ্যখাতের গুরুত্ব বিবেচনায় ঘাপটি মেরে থাকা দুর্নীতিবাজরা নিজেদের আখের গোছানোর জন্য খাতটিকে বেছে নেয়। ফরিদপুর মেডিকেলে কয়েকগুণ বেশি দামে সাধারণ পর্দা ও অন্যান্য মেডিকেল সরঞ্জাম ক্রয়, চট্টগ্রাম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য কেনাকাটায় সাধারণ যন্ত্রপাতির দাম কয়েকগুণ বেশি প্রস্তাব করা তো সাম্প্রতিক নজির। এর বাইরে প্রয়োজন নেই বা উপযোগিতা নেই এমন যন্ত্রপাতিও যে দেদারসে কেনা হচ্ছে কেবল কমিশন ভাগাভাগির জন্য- তার উদাহরণ ৮ বছর আগে কেনা ‘ইন্ট্রা অপারেটিভ ইমেজিং সিস্টেম’ মেশিন এখনও চালু করতে না পারা। পরিস্থিতি কত ভয়াবহ তা বোঝা যায় সম্প্রতি অনিয়মের কারণে একজন চিকিৎসক-অধ্যাপকের অবসর-পরবর্তী সুবিধা বাতিলে হাইকোর্টের আদেশ থেকে। স্বাস্থ্যখাতের বেড়া যখন এভাবে ক্ষেত খেয়ে যাচ্ছে, তখন রোগীরা চলে যাচ্ছে পার্শ্ববর্তী দেশে চিকিৎসার জন্য। এখনই স্বাস্থ্যখাতের অনিয়ম-দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরা না গেলে ভবিষ্যতে পস্তাতে হবে সবাইকে।
যুগান্তর