ডা. ইউশা এ এফ আনসারী :
গতকাল থেকে আবেগী বাঙ্গালির এক আমেরিকান খৃষ্টান দম্পতির তাদের মিশনারীর পক্ষে চিকিৎসা দেবার ভাইরাল পোস্টে আমিও বেশ আবেগী হয়ে পরেছি।
আমি বেশ সচ্ছল পরিবারের সন্তান। তাই আমার গল্প হয়তো অনেক চিকিৎসক বন্ধুর কষ্টের ধারেকাছেও যাবেনা।
২০০৫ সালে এমবিবিএস পাশ করেছিলাম মেধাতালিকায় অষ্টম হয়ে। একবছর ইন্টার্নশিপ করার সুবাদে রাত-দিন হাড়ভাঙ্গা খাটুনির বিনিময়ে একবছরে পেয়েছিলাম বাহাত্তর হাজার টাকা। এরপর জীবন আর ভবিষ্যতের পানে ছুটে চলা।
ট্রেনিং এবং কোর্সের নামে বিনা পারিশ্রমিকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দেড় বছর, ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অফ কিডনি ডিজিজেজ এন্ড ইউরোলজীতে ছয়মাস, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সাড়ে তিন বছর, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল ইউনিভার্সিটিতে একবছর কাজ করতে হয়েছিল। বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করেছি আর ট্রেনিং, কোর্স ফি, পরীক্ষার ফি বাবদ দিতে হয়েছে দেড় থেকে দুই লক্ষ টাকা। থিসিস আর ডিজার্টেশন করতে খরচ হয়েছে পকেটের অন্ততঃ তিন লক্ষ টাকা। রাত-দিন এক করে রোগী দেখেছি, রাতের পর রাত নির্ঘুম কাটিয়েছি।
ভাবছেন ঘর-সংসার ছিলো না; তা কিন্তু না। আমার ঘর আলো করে দুই কন্যা সন্তান এসেছিলো ততদিনে। কেমন করে চলেছি সে সময়ে, আল্লাহ তায়ালা ভালো জানেন। আমার মনে আছে, আমি কখনো বাচ্চাদের নিয়ে ভালো মন্দ খেতেও কোথাও যেতে পারিনি সে সময়ে। আমার মা’য়ের অসুস্থতার সময় কিছুই করতে পারিনি।
উনি মহান আল্লাহর ডাকে সাড়া দেবার আগের দিন বিকেলে (২২.০৫.১৫) প্রচন্ড শ্বাসকষ্ট নিয়েও জিজ্ঞেস করেছিলেন বাবা তোমার থিসিসের খবর কি? আমি কিন্তু উত্তর দিতে পারিনি সেদিনও।
২০১৫ তে এমডি (নেফ্রোলজি) কমপ্লিট করার পর আজকের জীবন দেখে কেউ কেউ হয়তো ঈর্ষান্বিত বোধ করেন, কিন্তু কেউ কি ফিরিয়ে দিতে পারবেন আমার মা’য়ের সান্নিধ্য, আমার সন্তানের ছেলেবেলা।
অনেকে আবার ট্যাক্সের টাকায় পড়ার গল্প শোনান! গত দশ বছরে আমি যে পরিমাণ টাকা ট্যাক্স দিয়েছি, তা হয়তো আপনি আজীবনেও দিবেন না। যদিও আপনিও ট্যাক্সের টাকায় পড়েছেন।
আল্লাহর রহমতে এখনো প্রতিদিন অন্ততঃ দশজন রোগী ফ্রিতে দেখি। এ আমার অহংকার……
লেখক : ডা. ইউশা এ এফ আনসারী
সহকারী অধ্যাপক, নেফ্রোলজি
উত্তরা আধুনিক মেডিকেল কলেজ
রংপুর মেডিকেল কলেজ
১৯৯৯-২০০০