আমার লেখাটি আজ খাদিজা কে নিয়ে , আর বাংলাদেশের গ্রামে গন্জে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা শত শত খাদিজা দের নিয়ে। খাদিজার বাড়ী সাতক্ষীরা, বয়স ৩৪ বছর,স্বামী ভ্যানচালক । আজ থেকে ৭ দিন আগে মংগলবার রাতে সে আমাদের ইউনিট এ যখন ভর্তি হয়েছিলো তখন তার ইতিহাস ছিলো এমন-
১)একদিন আগে সাতক্ষীরা তে তার সিজারিয়ান অপারেশন হয়েছিলো তার পেটে জমজ বাচ্চা এবং প্রেসার অনেক বেশী এই কারনে।
২)প্রচুর রক্তক্ষরন । সাতক্ষীরা তেই তাকে ৬ ব্যাগ রক্ত দেয়া হয়েছিলো।
৩) অপারেশন এর পর থেকে ইউরিন ব্যাগ এ এক ফোটা ও ইউরিন না আসা।
আমাদের ডাক্তার মেয়েরা এই মরনাপন্ন রোগী কে বাঁচানোর জন্য যার পর নাই যুদ্ধ শুরু করলো। রোগীর স্বামী কে রক্ত , ঔষধ আনতে বল্লে সে কিছু ঔষধ আনার পর আর পারলো না। রোগীর অবস্হা বোঝার জন্য ক্লিনিকাল পরীক্ষার পাশাপাশি কিছু ল্যাবরেটরী পরীক্ষা করতে স্যাম্পল পাঠানো হলো ।রোগীর বিছানার পাশে টেস্ট টিউবএর
রক্ত জমাট বাঁধার পরীক্ষা করে দেখা গেলো ২০ মিনিট পর ও রক্ত জমাট বাঁধছে না যেখানে ৪-১০ মিনিটের মধ্যেই রক্ত জমাট বাঁধার কথা।আমাদের এসিস্ট্যান্ট রেজিস্ট্রার রোগীর পেটে একটা সিরিঞ্জ ঢুকিয়ে দেখলো পেটের ভিতর থেকে রক্ত আসছে , তার মানে পেটের ভিতর রক্তক্ষরন হচ্ছে ।
সকালবেলায় রাউন্ড এ আমরা সাধারণত: ক্রিটিক্যাল রোগীদের আগে দেখি। আমরা যখন রাউন্ড এ রোগীর কাছে গেলাম তখন দেখি রোগী অজ্ঞান,শ্বাসকষ্ট হচ্ছে , চামড়ার সেলাই দিয়ে ও অনবরত: রক্তক্ষরন হচ্ছে ।আমি রোগীর পেটে হাত দিয়ে দুটো আলাদা চাকার মতো ফীল করলাম।আমরা বুঝে গেলাম বা ধারনা করে নিলাম রোগীর প্রেসার বেশী, রক্তক্ষরন ইত্যাদি সব জটিলতার জন্য
অলরেডী তার রক্ত না জমাটবদ্ধ জনিত সমস্যা (DIC) হয়ে গেছে এবং হতে পারে পেটের ভিতর কোন একটা ছেড়া রক্তনালী থেকে রক্তপাত হচ্ছে ।আমরা রোগীর স্বামীকে আরো রক্ত ,প্লাজমা জোগাড় করতে বললাম এবং অপারেশনের সিদ্ধান্ত নিলাম।
রোগীর স্বামী আমার ইউনিট প্রধান কে বললো “ ম্যাডাম যদি রোগী বাঁচার সম্ভাবনা থাকে তাহলে দৌড়া দৌড়ি করবো বা রক্ত ঔষধ জোগাড় করবো, না হলে কিছু জোগাড় করতে পারবো না ।”
আমার তখন মনে হলো দীর্ঘদিন সংসার করা আর স্বামী সংসার সন্তান দের লালন পালন করা খাদিজার ভাগ্য তার গোয়ালের গরুর মতোই …..যদিও তার পাঁচটা বাচ্চার কথা ভেবে , খাদিজার স্বামীর সাধ্যের মধ্যে এর চেয়ে বেশী কিছু করার সামর্থ তার স্বামীর নেই, এটাই খাদিজার নিয়তি।
আমরা ডাক্তার হয়ে তো আর সেটা হতে দিতে পারি না ।রোগীর শেষ নিশ্বাসটুকু নেয়া পর্যন্ত আমরা আমাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করে যাই।হাল ছাড়ি না।
আমার ইউনিট প্রধান আমাকে দায়িত্ব দিলেন এ রোগীর অপারেশন করার।
আমি সহকারী রেজিষ্ট্ার কে অপারেশন এর জন্য সবকিছু রেডী করতে বলে এবং সিনিয়র এনেস্থেটিস্ট এর কন্সালটেশন নিতে বলে আমরা অন্য রোগী দেখতে লাগলাম। একটু পর এসিস্টেন্ট রেজিস্ট্র্রার এসে আমাকে জানালো “ম্যাডাম , রোগীর পেট হঠাৎ করে অনেক বেশী ফুলে যাচ্ছে , রোগীর শ্বাসকষ্ট বেরে গেছে , রোগীর মুখ দিয়ে ফেনা বের হচ্ছে আর ল্যাবরেটরী থেকে ফোন করে জানালো রোগীর ব্লাড সুগার ২”।আমরা তখন ধরেই নিয়েছিলাম যে রোগীকে হয়তো আমরা আর বাঁচাতে পারবো না । এখনই সব শেষ।
তাড়াতাড়ি আমরা রোগীর কাছে ছুটে গেলাম । আমি তখন সিস্টারদের কাছ থেকে মোটা ব্লাডসেট নিড্ল এনে রোগীর পেটে ঢুকিয়ে দিলাম, সাথে নল ও স্যালাইন ব্যাগ লাগিয়ে দিলাম আর ওদের বললাম তাড়াতাড়ি ২৫% গ্লুকোজ যেখান থেকে হোক জোগাড় করে পুশ করতে । রোগীর পেটের ভিতর থেকে অনবরত নল দিয়ে রক্ত এসে ব্যাগ ভরে যেতে লাগলো, পেট কমার সাথে সাথে এবং ২৫% গ্লুকোজ পাওয়ার পর থেকে রোগীর শ্বাসপ্রশ্বাস ও স্বাভাবিক হতে শুরু করলো, রোগী চোখ মেলে তাকালো।ইতিমধ্যেই রোগীকে আমরা ওটি তে নিয়ে গেলাম এবং এনেস্থেসিয়ার সিনিয়র কনসাল্টেন্ট সহ বাকিরা ও রোগীর ম্যানেজমেন্ট এ যুক্ত হয়ে গেলো।আমার ইউনিট প্রধান ও শত ব্যস্ততার মাঝে ও বার বার ফোন করে রোগীর খোঁজ নিচ্ছেন।
রোগী চোখ খোলার পর যখন কথা বলার চেষ্টা করছিলো আর আর মুখ থেকে অক্সিজেনের মাস্ক টা বার বার সরিয়ে ফেলতে চাচ্ছিলো , আমি তখন খাদিজা কে জিজ্ঞেস করলাম “ খাদিজা তোমার কয়টা বাচ্চা?”
খাদিজা : “ আমার মোট পাঁচটে বাচ্চা, তিনটে বাড়ীত থুয়ে আইসেছি ,আরো দুটো হয়েছে সিজারে।আমার হাতে খুব ব্যথা , আমার হাতটা একটু কোথাও রাখপার দেন”।
আমি তখন খাদিজার হাতটা ধরে আমার হাতের উপর রাখলাম আর ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। একটা ভেজা গজ দিয়ে ওর ঠোঁট মুখ মুছে দিলাম ।মরনাপন্ন খাদিজার হঠাৎ বেঁচে ওঠা আমার ভেতরে ও প্রান সন্চার করলো।
এনেস্থেটিস্ট রোগীর গলার রক্তনালীতে সি ভি লাইন করলো এবং ইন্টিউবেট করার পর আমি আমার অভিজ্ঞ কলিগ দের নিয়ে অপারেশন শুরু করলাম। পেট খুলেই দেখি চামড়ার নীচে , রেকটাস শীথ এর নীচে মাংসের মধ্যে বিশাল এক রক্তের চাকা । আমরা এটা কে “সাবরেকটাল হেমাটোমা” বলি।সব ওপেন করার পর দেখি পেট ভর্তি রক্ত।সব ক্লিয়ার করে আমরা ব্লিডিং এর উৎস্য খুঁজতে লাগলাম। ইউরোলজিস্ট কে ও ইনভল্ভ করলাম কোন ইউরেটার বাঁধা পড়ার কারনে ইউরিন আসছে না কী না সেটা নিরুপনের জন্য।শুধু মাস্ ল এ একটা মোটা ছেড়া রক্তনালী ছাড়া আর কোথাও কোন ব্লিডিং পয়েন্ট পাওয়া গেলো না। সেটা বেধে দিয়ে , পেটের মধ্যে, রেকটাস শীথ এর নীচে, চামড়ার নীচে মোট তিনটা ড্রেইনটিউব রেখে আমরা অপারেশন শেষ করলাম ।আমার এসিস্টেন্ট রেজিস্ট্রার এর তখন সারারাত নাইট ডিউটি করে এই দীর্ঘ অপারেশন এ দাঁড়িয়ে এসিস্ট করার পর ঘুমে পড়ে যাওয়ার মতো অবস্হা।এদিকে এই রোগীকে ICU তে নিতে হবে কিন্তু ICU bed একটা ও খালি নেই । আমাদের ইউনিট হেড অনেক requests করে একটা বেড ম্যানেজ করতে পেরেছেন তা ও পাওয়া যাবে অনেক পরে। অগত্যা রোগীকে Post operative Ward এ রাখতে হলো , কারন বাইরে কোন ICU তে ভর্তি করানোর সামর্থ ওর স্বামীর ছিলোনা।সন্ধ্যার পর তাকে ICU তে শিফ্ট করা হলো।এদিকে অনেক চেষ্টার পরও রোগীর ইউরিন আসলো না, Creatinine দিনের পর দিন বাড়তেই লাগলো।রোগীর আর জ্ঞান ফিরলো না । তিনবার ডায়ালাইসিস করা হলো , তারপরও আর উন্নতি না হওয়ায় ওর স্বামী তাকে ওই অবস্হাতই ICU থেকে নিয়ে যেতে চাইছে কারন সে তখন গরু, জমি বিক্রি করে নি:স্ব।
শেষ পর্যন্ত খাদিজা গতরাতে তার ৫ টা বাচ্চাদের এতিম করে আর আমাদের সবার সব চেষ্টা কে ব্যর্থ করে দিয়ে না ফেরার দেশে চলে গেলো।
আমার এই লেখাটি দেশের গ্রামে গন্জে ছডিয়ে থাকা আর সব খাদিজাদের কাছে পৌঁছাবে কী না জানি না । আমি চাইবো অন্তত যারা খাদিজা দের মতো মায়েদের আশেপাশে থাকেন তাদের জানিয়ে দিন যে বিশ্ব স্ব্যাস্হ সংস্খার নিয়ম অনুযায়ী গর্ভাবস্হায় সর্বনিম্ন অন্তত চারবার এন্টিনেটাল চেক আপ এ আসা উচিত –
১) ৮-১২সপ্তাহের মধ্যে অন্তত একবার
২)২৪-২৮ সপ্তাহে একবার
৩) ৩২ সপ্তাহে
৪)৩৬ সপ্তাহে
নরমালি যেটা করতে হয়-
-২৮ সপ্তাহ পর্যন্ত প্রতি মাসে একবার
-২৮-৩৬ সপ্তাহ পর্যন্ত প্রতি দুই সপ্তাহ পর পর একবার
-৩৬ সপ্তাহের পর হতে প্রতি সপ্তাহে একবার
আমার অনেক গর্ভবতী রোগীরা গর্ভাবস্হার শেষের দিকে চেকআপ এ এসে বলে “ সারা প্রেগনেন্সি তে তো কোন সমস্যা অনুভব করি নাই তাই চেক আপ এ আসি নাই”
পরীক্ষা করলে তাদের কারো কারো হাই প্রেসার বা ডায়াবেটিস বা রক্তশুন্যতা পাওয়া যায় যেগুলো একেবারে শেষের দিকে চিকিত্সা করা একটু ডিফিকাল্ট হয়ে যায় , অথচ রেগুলার চেকআপ এ সেগুলো Preventable ছিলো।
এমনকি গর্ভপরবর্তী বা Post natal checkups বলে যে একটা চিকিত্সা আছে সেটা ও অনেক রোগী ই জানে না।
তাহলে খাদিজার ম্রিত্যুর জন্য দায়ী কারা?????
দেশ?
সমাজ?
আমরা ডাক্তাররা?
না কী খাদিজা নিজে?
খাদিজার জীবনের শেষ কথাগুলো হয়েছিলো আমার সাথেই।
আমি অনেক ভেবেছি খাদিজার এই ম্রিত্যু কী Preventable ছিলোনা? আমি বা আমাদের কী আরো কিছু করার ছিলো ওঁকে বাঁচানোর জন্য বা আমাদের চেষ্টার কী কোন ঘাটতি ছিলো?
একটু ভেবে দেখুনতো খাদিজার সদ্য ভুমিষ্ট ২ টা বাচ্চা সহ ৫ টা বাচ্চার এখন কী হবে??
এ বোঝা কী শুধুই খাদিজার স্বামীর???????
Dr. Rushdana Rahman Toma
Assistant Professor
Department of Gynae and Obs
Dhaka Medical College Hospital