উন্নত বিশ্বের আদলে দেশের সরকারি-বেসরকারি স্বাস্থ্যশিক্ষার (মেডিকেল) মান নিশ্চিত করতে ‘স্বাস্থ্যশিক্ষা অধিদফতর’ নামে নতুন একটি অধিদফতর হচ্ছে।

অধিদফতরের মহাপরিচালকসহ (ডিজি) ১৭৮টি জনবল কাঠামোর অনুমোদন দিয়েছে প্রশাসনিক উন্নয়ন সংক্রান্ত সচিব কমিটি। এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অধীন স্বাস্থ্য অধিদফতর দু’ভাগে বিভক্ত হচ্ছে।

স্বাস্থ্যশিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগের অধীনে গঠিত নতুন স্বাস্থ্যশিক্ষা অধিদফতর স্বাস্থ্যশিক্ষা সংক্রান্ত সব ধরনের প্রতিষ্ঠানের একাডেমিক, প্রশাসনিক, উন্নয়ন ও গবেষণার বিষয়গুলো দেখভাল করবে। অধিদফতরের কার্যক্রম শুরু করতে শিগগিরই মহাপরিচালক (ডিজি) নিয়োগ দেয়া হবে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের ২৯টি গুরুত্বপূর্ণ পদ নতুন অধিদফতরে স্থানান্তর করা হবে।

এতদিন স্বাস্থ্যশিক্ষা সংক্রান্ত সব প্রতিষ্ঠানের কাজ দেখভাল করত স্বাস্থ্য অধিদফতর। বিভক্ত হওয়ায় এর প্রশাসনিক ক্ষমতা কমে যাবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। এ বিষয়ে স্বাস্থ্যশিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগের সচিব শেখ ইউসুফ হারুন বুধবার বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে দুটি বিভাগের সৃষ্টি হওয়ায় স্বাস্থ্যশিক্ষা সংক্রান্ত বিষয়ে প্রশাসনিক জটিলতার সৃষ্টি হয়েছিল।

স্বাস্থ্য অধিদফতরে প্রচণ্ড কাজের চাপ থাকায় কর্মকর্তাদের সবদিক খেয়াল রাখার সুযোগও কম থাকত। স্বাস্থ্যশিক্ষার মান উন্নত করতে আরেকটি অধিদফতরের প্রয়োজন ছিল। এটা সময়েরও দাবি। এখন থেকে সরকারি-বেসরকারি মেডিকেল কলেজ, ম্যাটস ও ইন্সটিটিউট অব হেলথ টেকনোলজিসহ স্বাস্থ্যশিক্ষা সংক্রান্ত সব প্রতিষ্ঠানের সার্বিক বিষয় নতুন স্বাস্থ্যশিক্ষা অধিদফতর দেখভাল করবে। ফলে দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক জটিলতাও দূর হবে বলে আমরা মনে করি।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) সভাপতি অধ্যাপক ডা. ইকবাল আর্সলান বৃহস্পতিবার বলেন, ‘মেডিকেল শিক্ষার ব্যাপক প্রসার ঘটায় স্বাস্থ্য অধিদফতরের বর্তমান কাঠামোর জনবল দিয়ে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না। এজন্য আরেকটি অধিদফতরের দরকার ছিল। নতুন অধিদফতর গঠন করায় সরকারকে স্বাগত জানাই। এতে মেডিকেল শিক্ষার মানোন্নয়নে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান কাজ করবে এবং জনগণ এর সুফল পাবে বলেই আমার বিশ্বাস।’

স্বাস্থ্যশিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশে মেডিকেল কলেজের সংখ্যা আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। এছাড়া মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যাও কম নয়। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উচ্চতর ডিগ্রি নেয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু পর্যাপ্তসংখ্যক শিক্ষক নেই। ফলে প্রকৃত স্বাস্থ্যশিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন শিক্ষার্থীরা।

এসব বিষয় নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ ও দেখভালের জন্য আলাদা স্বাস্থ্যশিক্ষা অধিদফতর প্রয়োজন। অন্যদিকে দেশে সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পাশাপাশি বেসরকারি পর্যায়ে অসংখ্য হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার গড়ে উঠেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের সেবার মান দেখার জন্য পর্যাপ্ত জনবল নেই।

জানা গেছে, স্বাস্থ্যশিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগের অধীনে স্বাস্থ্যশিক্ষা অধিদফতর গঠন করা হয়েছে। দেশের সব স্বাস্থ্যশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর (সরকারি-বেসরকারি মেডিকেল কলেজ, ইন্সটিটিউট অব মেডিকেল হেলথ টেকনোলজি, নার্সিং ইন্সটিটিউট এবং মেডিকেল অ্যাসিস্টেন্ট ট্রেনিং স্কুল) একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম এ অধিদফতর দেখভাল করবে।

পাশাপাশি এটি এসব প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও জনবলের সমন্বয়সহ সার্বিক দিক তত্ত্বাবধান করবে। আগে এগুলো স্বাস্থ্য অধিদফতর নিয়ন্ত্রণ করত।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, নতুন অধিদফতর গঠনের প্রস্তাব ৭ নভেম্বর প্রশাসনিক উন্নয়ন সংক্রান্ত সচিব কমিটির বৈঠকে উপস্থাপন করা হলে তা অনুমোদন দেয়া হয়। প্রস্তাবে বলা হয়, ২০১৭ সালের ১৬ মার্চ স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় পুনর্গঠন করে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ এবং স্বাস্থ্যশিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগ নামে দুটি বিভাগ গঠন করা হয়।

এর আগে ২০১৬ সালে এ সংক্রান্ত প্রস্তাব উপস্থাপন করা হলে ‘স্বাস্থ্যশিক্ষা অধিদফতর’ গঠনের নির্দেশনা দেয় প্রশাসনিক উন্নয়ন সংক্রান্ত সচিব কমিটি। কিন্তু দীর্ঘদিনেও এ অধিদফতর গঠন না হওয়ায় দুই বিভাগের কার্যক্রমে জটিলতার সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে স্বাস্থ্যশিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগের আওতাধীন মেডিকেল কলেজ এবং অন্যসব স্বাস্থ্যশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একাডেমিক, প্রশাসনিক, উন্নয়ন, গবেষণা ও অন্যসব কার্যক্রমে সমন্বয়হীনতার সৃষ্টি হয়। এ প্রেক্ষাপটে স্বাস্থ্যশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য স্বাস্থ্যশিক্ষা অধিদফতর গঠন করা প্রয়োজন।

২০১৮ সালের ১৪ নভেম্বর এ সংক্রান্ত প্রস্তাবে সায় দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এতে চলতি বছরের ২৫ আগস্ট জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এবং ১৬ সেপ্টেম্বর অর্থ বিভাগ সম্মতি দেয়। স্বাস্থ্যশিক্ষা অধিদফতর গঠনের জন্য জাতীয় রাজস্ব খাতে স্থায়ী ৩১টি ক্যাডার পদ, অস্থায়ীভাবে ১১৮টি পদসহ ১৪৯টি নতুন পদ সৃজনের প্রস্তাবে সম্মতি দিয়েছে সচিব কমিটি। বাকি ২৯টি পদ স্বাস্থ্য অধিদফতরের সাংগঠনিক কাঠামোভুক্ত পদ স্বাস্থ্যশিক্ষা অধিদফতরে স্থানান্তর করা হবে। এতে কার্যপরিধি কমে আসবে স্বাস্থ্য অধিদফতরের।

সূত্র : যুগান্তর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *