ডাঃ জহির সাদিক : গত এক সপ্তাহ ধরে খেয়াল করছি যেখানেই নীতুর সাথে দেখা হচ্ছে সে আমার দিকে কিছুক্ষণ পর পর তাকাচ্ছে। নীতু সেকেন্ড ইয়ার। আমি ফোর্থ ইয়ার। ক্যাম্পাসে নীতু সুন্দরী হিসেবেই পরিচিত। আজ কেন জানি আরো সুন্দর লাগছে। জীবনে এই প্রথম কোন সুন্দরী মেয়ে বারবার আমাকে দেখছে। কেমন যেন লজ্জা লজ্জা লাগছে।

নীতুর তাকানোর ধরনটা একটু অন্য রকম। অনেকটা প্রেমে পড়লে মেয়েরা যেভাবে তাকায়। আমার মন বলছে নীতু আমার প্রেমে পড়েছে। প্রেমে না পড়লে এভাবে তাকানোর কথা না। আমি অনেকটা নিশ্চিত আমার জীবনে কিছু একটা হতে চলেছে। লজ্জার সাথে একটু খুশী খুশীও লাগছে।

পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়ার জন্য নীতুর কাছে যেতে হবে। কাছে গিয়ে ওর চোখে চোখ রাখব। চোখ দেখে মনের কথা আঁচ করা যায়, যেটা এতদূর থেকে সম্ভব না। পরক্ষণেই ইচ্ছেটা দমন করে হোস্টেলের দিকে হাঁটা শুরু করলাম। না আজ না, আরেকটু প্রস্তুতি দরকার।

হাঁটার সময় খেয়াল করলাম আমার ভেতরে এক ধরনের ভাব চলে আসছে। নিজেকে কেমন যেন প্রেমিক পুরুষ মনে হচ্ছে। লজ্জা, খুশী আর গর্ব, সবই হচ্ছে।

রুমে ঢোকার সাথে সাথে রুমমেট পিয়াল বলে উঠলো,
দোস্ত! তোরে আজ এত সুন্দর লাগছে কেন?

অন্যদিন হলে পিয়ালের কথা বিশ্বাস করতাম না। কিন্তু আজ কেন জানি ওর কথা সত্য মনে হচ্ছে। দেয়ালের সাথে লাগানো আয়নার দিকে তাকালাম। খেয়াল করলাম আমার কালো মুখটা লজ্জায় বেগুনি হয়ে আছে। মাথার কোঁকড়া চুল কদম ফুলের মত ফুটে আছে। কদম ফুল নিশ্চয় নীতুর খুব পছন্দ..!
মনে মনে বললাম, দোস্ত তুই ঠিকই বলেছিস। প্রেমে পড়লে সুন্দর তো লাগবেই।

লাঞ্চের পর হালকা একটা ভাতঘুম দিলাম।
ঘুমানোর আগে মনে হচ্ছিল আজ নিশ্চিত একটা স্বপ্নটপ্ন দেখবো। আমার ধারনা সত্যি হলো।

ভরদুপুরে এক নদীর পাড়ে নীতুর হাত ধরে বসে আছি। কিছুক্ষণ পর পর নীতু তার ওড়না দিয়ে আমার কপালের ঘাম মুছে দিচ্ছে..।
নীতু জিজ্ঞেস করছে, এত ঘামছেন কেন?
উত্তরে বললাম, তুমি পাশে থাকলে আমার সিমপ্যাথেটিক সিস্টেম উল্টোপাল্টা হয়ে যায়.. এই কারনে অতিরিক্ত ঘামছি। এসব নিয়ে তুমি চিন্তা করোনা। নিশ্চিত থেকো বিয়ের পর ওইসব সিমপ্যাথেটিক সিস্টেমসহ শরীরের কোন সিস্টেমই ঠিকমত কাজ করবে না!
নীতু বললো, আপনি দেখতে অনেকটা সুনীল শেঠির মত..!

আহা! এমন করে কেউ কখনও বলেনি আমাকে। আসলেই সুন্দর হয়ে যাচ্ছি, প্রেম হলে যা হয় আর কি!

হঠাৎ রুমের ভিতরে পিয়াল আর রোকনের চেঁচামেচিতে এত সুন্দর একটা স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। শালারা চিৎকার করার আর সময় পেল না..!

ওয়াশরুমে যেয়ে আয়নার সামনে দাঁড়ালাম। নিজের চেহারাটা আর একবার পুঙ্খানুপুঙ্খ দেখলাম। চেস্ট এবং হাতের মাংসপেশি একটু ভালো করে পরখ করে নিলাম। বুঝতে পারছি না কেন স্বপ্নের মধ্যে নীতু আমাকে সুনীল শেঠি বললো??

প্রায় চার বছর দুই মাস হতে চললো এই ক্যাম্পাসে আছি। কখনও আমার জীবনে এমন হুড়মুড় করে প্রেম আসেনি। কি আশ্চর্য! কি হতে কি হয়ে গেল যে প্রেম আমার উপরে এসে রীতিমত হাবুডুবু খাচ্ছে।

সন্ধ্যার পর খুব করে লাইব্রেরিতে যেতে ইচ্ছে হলো। কারন একটাই। লাইব্রেরিতে গেলে নীতুর সাথে দেখা হবে। নীতুকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে। লজ্জা, খুশী, গর্বের পাশাপাশি হৃদয়ে এক ধরনের নাচন বোধ করছি।

লাইব্রেরিতে ঢুকেই একবার চারপাশটাকে দেখে নিলাম। নীতু লাইব্রেরির পিছনের দিকে বসে আছে।
কি সর্বনাশ! আমার দিকে সত্যি সত্যি ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে। আমি নিশ্চিত, নির্ঘাৎ মেয়েটা আমার প্রেমে পড়েছে! আমাকে দেখে কোন সুন্দরী মেয়ে যে এভাবে ক্রাশ খেতে পারে এটা ধারনা ছিল না!!!

আমি একটা টেবিলে বসে আছি আর আড়চোখে নীতুকে দেখছি। নীতুও আমাকে দেখছে। এভাবে ঘন্টাখানিক বসে থাকার পর নীতু এসে আমার সামনের চেয়ারটাতে বসল। এই প্রথম এত কাছ থেকে নীতুকে দেখছি। অদ্ভুত সুন্দর একটা মেয়ে। চোখে চোখ রেখে বেশিক্ষন তাকানো যায়না। আমার হার্টবিট বেড়ে যাচ্ছে।

— কেমন আছেন ভাইয়া?
— জ্বী ভালো।
— আপনার সাথে আমার গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথা আছে।
— বলো।
— এখানে না.. ক্যান্টিনে আসেন।

কথাগুলো বলেই নীতু লাইব্রেরি থেকে বের হয়ে গেল। আমি বসে আছি। আমার ঠোঁট মুখ শুকিয়ে আসছে। নীতুর কথা শোনার জন্য আমার ভিতরে কৌতূহল বেড়ে যাচ্ছে। হন্তদন্ত হয়ে ক্যান্টিনের দিকে পা বাড়ালাম। পকেট থেকে চিরুনি বের করে দুবার এলোমেলো চুলগুলো ঠিক করে নিলাম। আমি নিশ্চিত, পুরোপুরি নিশ্চিত, আজ আমার জীবনে সত্যি সত্যি কিছু একটা ঘটতে চলেছে।

কলেজ ক্যান্টিনে দুজনে মুখোমুখি বসে আছি। নীতুর মন বিষণ্ণ মনে হচ্ছে।
জিজ্ঞেস করলাম,
— মন খারাপ কেন?.. কিছু বলবে?
— জ্বী ভাইয়া।
— বলো।
— কিছু মনে করবেন না ভাইয়া.. আপনি আমার বড় ভাইয়ের মত.. আপনার সাহায্য আমার খুব দরকার।
“বড় ভাইয়ের মত”!! শুরুটা ঠিক মনমতো হচ্ছে না। সেটা চেপে বললাম,
— আচ্ছা ঠিকাছে.. বলো।
— ভাইয়া, আপনার রুমমেট পিয়াল ভাইকে আমার খুব পছন্দ.. ভীষন পছন্দ.. আপনি উনাকে আমার কথাটা কি বলবেন?

মুহুর্তের মধ্যে আমি আমার সমস্ত কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেললাম। হঠাৎ করে বড় ধরনের দুঃসংবাদ শুনলে মানুষের জবান বন্ধ হয়ে যায়। বেশ কিছুটা সময় আমার অবস্থা তাই হলো। খেয়াল করলাম নীতুর চোখদুটো ভিজে আসছে। আমি ওর ভেজা চোখের দিকে তাকিয়ে আছি। বন্ধু পিয়ালের জন্য মেয়েটির ফিলিংস দেখে সত্যিই অবাক হচ্ছি..!

আমার চোখের কোনায় আঙুল স্পর্শ করে মনে হলো আমার দু’চোখে শিশির বিন্দুর মত পানি জমা হতে শুরু করেছে। অদ্ভুত ব্যাপার হলো আমরা দুজনেই কাঁদছি। আমি নীতুর জন্য কাঁদছি আর নীতু কাঁদছে আমার বন্ধু পিয়ালের জন্য।
হায়রে পিয়াল! এটা তুই কি করলি? এই ছিল তোর কপালে??

নীতু চোখ মুছতে মুছতে বললো,
— ভাইয়া, আপনি কাঁদছেন কেন? আপনার আবার কি হলো?

বললাম, ওসব কিছুনা.. ছোটবেলা থেকে রোমান্টিক কোন সিনেমার করুণ দৃশ্য দেখলে চোখ ভিজে যেত। আজ তোমার প্রেমের গভীরতা স্বচক্ষে দেখার পর একইরকম ভাবে চোখ ভিজে যাচ্ছে ..!!

আমার কথা শুনে নীতু খুশি হলো।

নীতুর সামনে আর বেশিক্ষণ বসে থাকা ঠিক হবে না। আমার হৃদয় চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। সব আশা আর কল্পনা মন থেকে বিদায় নিচ্ছে। আপাতত সেখানে শুধু হতাশা বিরাজ করছে। বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার। আজ সম্ভবত আমাবস্যা। প্রকৃতি ইচ্ছে করে এমন একটা দিনকে বেছে নিয়েছে!

ক্যান্টিন থেকে বের হলাম। ক্ষতবিক্ষত হৃদয়ে নীতুর প্রপোজাল সংগে নিয়ে বন্ধু পিয়ালের খোঁজে সোজা হোস্টেলের দিকে পা বাড়ালাম।।

ডাঃ জহির সাদিক
KMC/91-92

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *