ডাঃ ইব্রাহীম ইভান : আমি ইংল্যান্ডের যে হাসপাতেলে কাজ করি, সেখানের লিড মাইক্রোবায়োলজিস্ট মোটামুটি একটা যুদ্ধে নেমেছেন যে তিনি এখানকার প্রতিটা ডাক্তারকে antibiotics এ শতভাগ সচেতন বানাবেন।

উনার একটা সেমিনার এটেন্ড করে কয়েকটা ব্যাপার আত্মস্থ করেছি। আমার মনে হয় কিছু জিনিস ডাক্তার-জনগণ সবারই ভালমত জানা এবং মনে রাখা উচিতঃ

১) এন্টিবায়োটিক ব্যাথার ওষুধের মত না, যে একটাতে কাজ না করলে একটু “বেশি পাওয়ারফুল” ওষুধ দেয়া যাবে।

এন্টিবায়োটিক হলো স্পেক্ট্রাম ভিত্তিক। ফ্লাড লাইট এ কাজ না হলে টর্চলাইট এর পরে লেজার লাইট। মানে কিছু কিছু এন্টিবায়োটিক আছে যেগুলা অনেক ধরণের জীবাণুকে মারতে পারে (Broad Spectrum), আর কিছু কিছু এন্টিবায়োটিক এত বেশি কাভার করতে পারেনা (Narrow Spectrum). ব্যাকটেরিয়া জনিত কোন রোগের চিকিৎসা শুরু হয় broad spectrum দিয়ে পরে ল্যাবে কালচার করে যদি স্পেসিফিক জীবানুটা কি আমরা জানতে পারি তাহলে আমরা সেই জীবাণুর জন্য স্পেসিফিক ঘাতক Antibiotic কী সেটাও জানতে পারি।

এখানে অনেক কিন্তু আছে-
ক) সবসময় ল্যাবে কালচার করে পর্যাপ্ত জীবানু জন্মানো যায় না।
খ) সব suspected bacterial রোগে কালচার করার মত রিসোর্স সব জায়গায় থাকা সম্ভব না।

তাই চিকিৎসা হয় রোগীর রেসপন্সের উপর ভিত্তি করে। একজন ডাক্তার তার কষ্টে অর্জিত ডিগ্রির মাধ্যমে জানেন, নিউমোনিয়া কোন কমন জীবাণু দ্বারা হতে পারে আর প্রসাবের রাস্তার ইনফেকশন কোন কমন জীবাণু দ্বারা হতে পারে। সেই জ্ঞানের উপর ভিত্তি করেই শুরু হয় broad spectrum (ফ্লাড লাইট) চিকিৎসা।

২) এন্টিবায়োটিক ব্যাথার ওষুধের মত না, যে ব্যথা কন্ট্রোলে চলে আসলে নিয়মিত আর খেতে হয়না।

এন্টিবায়োটিক কাজ করতেসে আপনার শরীরের ভেতর জীবাণুর বিরুদ্ধে। জীবাণুর জীবনের মূল লক্ষ্য – বংশবৃদ্ধি। সাধারণত আপনার শরীরে রোগ-ঘটানো জীবাণু একটা নির্দিষ্ট লেভেলে না উঠলে সেই রোগের লক্ষণ প্রকাশ পায় না। তার রোগ অনুযায়ী আমরা জানি যে কতদিনের কোর্স এই এন্টিবায়োটিক খেতে হবে। তিন দিন পরে আপনি সুস্থ হয়ে গেছেন মানে এইনা আপনার শরীরে রোগ-ঘটানো জীবাণু সব মারা গেছে। উদাহরণ দিলে, ধরেন আপনি যখন অসুস্থ ছিলেন তখন হয়তোবা ২০০০০০ জীবাণু ছিল, দুই দিন এন্টিবায়োটিক খেয়ে সেটা ১০০০০ এ নামায়া আসাতে আপনি সুস্থ বোধ করতেছেন। এই যে ১০০০০ জীবাণু বেঁচে গেসে এরা কিন্তু বলতে গেলে সেই এন্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ জয় করেছে। এখন আপনি যদি আরো এন্টিবায়োটিক সৈন্য না পাঠান তাহলে এই ফাঁকে তারা নতুন অস্ত্র বানায়ে ফেলবে পরে আর সেই এন্টিবায়োটিক আর ওই জীবাণুর উপর কাজ করবেনা।

ব্যাপারটা এত সিম্পল না, কিন্তু সহজভাবে বললে এটা নামই “Antibiotic Resistance”.

৩) “আমি বরাবরই সুস্থ থাকি – জীবনে খুব কমই এন্টিবায়োটিক খেয়েছি, তাই Resistance আমার ভেতরে হবে না!”

খুবই কমন ভুল ধারণা। Resistant মানুষ হচ্ছে না, হচ্ছে জীবাণুরা। আমাদের সকলের অসচেতনতায় আমরা অনেক জীবাণুদের অপ্রতিরোধ্য বানাচ্ছি। তাই আপনি যতই সুস্থ হোন না কেন খারাপ কপালে যদি আপনার সেইরকম ঢাল-তলোয়ার ওয়ালা জীবাণু দ্বারা ইনফেকশন হয় তাহলে সেটা মোকাবেলা করা অনেক দিন দিন অনেক কষ্টসাধ্য হয়ে যাবে।

আরো অনেক কিছু লেখার আছে কিন্তু আমার মনে হয় আপামর জনসাধারণেরও এই বিষয়ে যত সম্ভব জানা উচিত। রোগের চিকিৎসা রেজিস্টার্ড ডাক্তারের হাতেই ছেড়ে দেয়া উচিত।

সেধে সেধে এন্টিবায়োটিক খেয়ে আপনি আপনার এবং আপনার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য “সুপারবাগ” তৈরি করেছেন না তো?

লেখক:ডাঃ ইব্রাহীম ইভান
Internal Medicine Trainee

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *