অধ্যাপক ডা. আবুল হাসনাৎ মিল্টন : বিকেলে মৃত্যুভয়, রাত্রিতে জেগে ওঠা

আমি সাতার জানি না, তাই নদী বা সমুদ্র ভ্রমণে খুব সতর্ক থাকি। যতটা না নিজের কারণে, তার চেয়ে অনেক বেশী পার্থিব-পূর্ণতার জন্য। ওদের নিয়ে আমি যে কোন নৌযানে উঠি না।

ইন্দোনেশিয়ায় হাজারেরও বেশী দ্বীপ আছে। বালি থেকে প্রতিদিন যাত্রীবাহী ছোট ছোট নৌযানে চড়ে পর্যটকরা বিভিন্ন দ্বীপে বেড়াতে যায়। আমার যাবার প্রশ্নই ওঠে না। গতকাল নূপুরজানের একমাত্র ভাই নয়ন ও তার বউ পৌষী নুসা পেনিদা দ্বীপে বেড়াতে গেছে, আজ বিকেলে তারা ফিরেছে। ভাই গেছে, তাই নূপুরজান ইন্টারনেট ঘেটে কাল দারুণ একটা ডিল পেয়েছে। আজ সকাল সাতটায় নূপুরজানের বাবা-মা, পার্থিব-পূর্ণতা, নূপুরজানও আমি নুসা পেনিদা দ্বীপের উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বেরোলাম। শখানেক যাত্রীবাহী ছোট জাহাজ, মানে স্পিডবোটের চেয়ে একটু বড়। প্রশান্ত মহাসাগরের বুক চিরে চল্লিশ মিনিটের পথ। যাবার সময় সমুদ্র শান্তই ছিল। সারাদিন দ্বীপে কাটানোর পর বিকেল পাঁচটায় ফেরার ট্রিপ।

জাহাজে উঠে মিনিট দশেক যেতেই সমুদ্র উত্তাল। আমাদের ছোট্ট নৌযানটা পরের বিশ মিনিট চরম ঝাঁকানো শুরু করলো। পূর্ণতার ভাষায়, ‘জাহাজটা একবার আকাশে উড়ে যাচ্ছে, পর মুহূর্তেই আবার পানিতে থুবড়ে পড়ছে’। দ্রুত লাইফ জ্যাকেট পরে আল্লাহকে ডাকা শুরু করলাম। পার্থিব-পূর্ণতা ভয় পাওয়া দুটো পাখির বাচ্চার মত জুবুথুবু হয়ে বসে আছে। নূপুরজান ওদের মনে সাহস সঞ্চার করার চেষ্টা করে যাচ্ছে, ওরা যাতে ভয় না পায়। একেকবার জাহাজটা আচড়ে পড়ে, আর পুরো জাহাজের মানুষগুলো চিৎকার করে ওঠে। আমার নূপুরজানের উপর খুব রাগ হচ্ছিল। কী দরকার ছিল দ্বীপে যাবার নামে এই প্যারা নেবার!

বাসায় ফিরে মাগরিবের নামাজের শেষে দুরাকাত নফল নামাজ কেবল শেষ করেছি, এমন সময় পূর্ণতা মোবাইল ফোনটা এগিয়ে দিল। ড. মার্টিন স্টুয়ার্ট ফোন করেছে, ফোনটা ধরলাম। মার্টিন তরুণ গবেষক, আমেরিকার এমআইটি থেকে ফিরে সিডনিতে একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করে। ওর এক ভাই ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মধ্য ত্রিশে মারা গেছে। ক্যান্সার নিয়ে আমারো খুব কষ্টের স্মৃতি আছে। আমার শাশুড়ি এগারো মাস ক্যান্সারে ভুগে আমার হাতেই মৃত্যুবরণ করেছিলেন। চিকিৎসার পুরোটা সময় আমি তার সাথে ছিলাম। মূল প্রস্তাবটা মার্টিনের, আমাকে ওর সাথে পরিচয় করে দিল সিডনির রেমন্ড সোলায়মান। সব শুনে আমি ঢাকায় বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ ডা. নাজির মোল্লার সাথে যোগাযোগ করলাম। প্রাথমিক গবেষণাটা আমরা ঢাকায় করতে চাই। এ বছর এপ্রিলে মার্টিন আর আমি ঢাকায় গিয়ে বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে সেমিনার করলাম। গবেষণার ব্যাপারে সবাই খুবই আগ্রহ দেখালেন।

পরিকল্পনা চুড়ান্ত, এবার ফান্ড যোগাড় করার পালা। গবেষণার কথা শুনেই রেডিয়েন্ট ফার্মার মালিক নাসের শাহরিয়ার জাহেদী ভাই সাথে সাথে দশ লাখ টাকা দেবেন বলে জানালেন। আরো প্রয়োজন ৫০ হাজার ডলার। অনলাইনে গোগেটফান্ডিংয়ে ফান্ড রাইজিংয়ের জন্য পেজ খুললাম, কিন্তু নানান ব্যস্ততায় সময় দিতে পারছিলাম না। আজ মার্টিন ফোন করে জানালো, একজন অস্ট্রেলিয়ান ৩০ হাজার ডলার অনুদান দিতে রাজি হয়েছেন। আর বাকি রইলো ১৯ হাজার অস্ট্রেলিয়ান ডলার, মানে প্রায় ১২ লাখ টাকা। এখন আশাবাদি হওয়া যায়, সব প্রস্তুতি সেরে ইনশাআল্লাহ আগামী বছরের এপ্রিল-মে’র মধ্যে গবেষণার কাজটা শুরু করতে পারবো। প্রাথমিক গবেষণাটা সফল হলে ক্যান্সারাক্রান্ত মানুষের নিরাময় কতটুকু হবে এখনি বলতে পারবো না, তবে এর পাশাপাশি রোগীর কষ্ট ও জটিলতা কিছুটা কমার কথা। যেহেতু শুরুতে পাইলট ফেজ পরিচালনা করবো, তাই এই মুহূর্তে আগ বাড়িয়ে অনেক কিছুই বলতে পারছি না। দোয়া করবেন, গবেষণায় যেন পজিটিভ রেজাল্ট পাই, সে ক্ষেত্রে ক্যান্সার রোগীরা অন্তত কিছুটা হলেও স্বস্তি পাবেন। শুরুতে আমরা কোলোরেক্টাল ক্যান্সার এবং একিউট মাইলয়েড লিউকেমিয়া (এএমএল) নিয়ে কাজ করবো। আমার ধনী বন্ধুরা যদি গবেষণায় অর্থনৈতিকভাবে সহযোগিতা করতে চান, তাহলে নীচের ওয়েবসাইটে গিয়ে অথবা ঢাকায় ডা. নাজির মোল্লার সাথে (আমাকে ইনবক্সে জানাতে পারেন)
যোগাযোগ করে সহায়তা করতে পারেন।

সবাইকে অনেক ধন্যবাদ। বেঁচে থাকা নেহায়েত মন্দ নয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *