বিদেশফেরত যাত্রীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একটি থার্মাল স্ক্যানার (আর্চওয়ে বা দরজার চৌকাঠের মতো দেখতে একধরনের যন্ত্র, যাতে জ্বর মাপা হয়) থাকলেও সেটি দেড় বছর ধরে বিকল। আর চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কোনো থার্মাল স্ক্যানারই নেই। দুই বিমানবন্দরেই ‘হ্যান্ডহেল্ড’ (হাতে বহন করা যায়) থার্মোমিটারে জ্বর মাপা হয়। যদিও করোনাভাইরাস প্রতিরোধে গত ২১ জানুয়ারি থেকে দেশের তিনটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিশেষ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছে সরকার।
এদিকে করোনাভাইরাস প্রতিরোধে দেশের তিনটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিদেশফেরত সব যাত্রীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এর অংশ হিসেবে ঢাকা, চট্টগ্রাম এবং সিলেট বিমানবন্দরে বিদেশ থেকে আসা সব যাত্রীর হেলথ ডিক্লারেশন ফরম (স্বাস্থ্য সংক্রান্ত তথ্য উল্লেখ করা) পূরণ করতে হচ্ছে। গতকাল শুক্রবার ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এই ব্যবস্থা কার্যকর করা হয়েছে।
গত ২১ জানুয়ারি থেকে ৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত শুধু চীন থেকে আসা সরাসরি ফ্লাইটের যাত্রীদের হেলথ ডিক্লারেশন ফরম করতে হতো। এখন বিদেশ থেকে আসা সব যাত্রীকে এই প্রক্রিয়ার আওতায় আনা হয়েছে। হেলথ ডিক্লারেশন ফরম পূরণ করার বিষয়ে দেশি-বিদেশি সব বিমান সংস্থাকে গত বৃহস্পতিবারই চিঠি দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
বিদেশফেরত যাত্রীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তিনটি থার্মাল স্ক্যানার রয়েছে শাহজালাল বিমানবন্দরে। এর মধ্যে একটি স্ক্যানার ভিআইপি যাত্রীদের জন্য এবং দুটি স্ক্যানার সাধারণ যাত্রীদের পরীক্ষার জন্য রাখা হয়েছে। এ ছাড়া চারটি হ্যান্ডহেল্ড থার্মোমিটারে যাত্রীদের শরীরের তাপমাত্রা মাপা হচ্ছে।
হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহারিয়ার সাজ্জাদ বলেন, যাত্রীদের স্বাস্থ্যসেবা দিতে শাহজালাল বিমানবন্দরে স্বাভাবিক সময়ে তিন শিফটে (পালা) মোট চারজন চিকিৎসক ও ১০ জন নার্স কাজ করতেন। করোনাভাইরাস প্রতিরোধে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে দেশের প্রধান এই বিমানবন্দরে এখন ১৯ জন চিকিৎসক কাজ করছেন। প্রতিটি শিফটে চারজন চিকিৎসকের সঙ্গে চারজন স্যানিটারি ইন্সপেক্টর (স্বাস্থ্যকর্মী) ও দুজন নার্স রয়েছেন। রোগীদের আনা–নেওয়ার জন্য তিনটি অ্যাম্বুলেন্স বিমানবন্দরে রাখা হয়েছে।
প্রতিদিন ১২–১৩ হাজার যাত্রী বিদেশ থেকে শাহজালাল বিমানবন্দরে আসেন। এত যাত্রীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা ওই বাড়তি জনবল দিয়ে সম্ভব কি না, জানতে চাইলে বিমানবন্দরে স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহারিয়ার সাজ্জাদ বলেন, সমস্যা হওয়ার কথা নয়। তবে চিকিৎসক, নার্সের বাইরে অন্য কাজের জন্য জনবল বাড়ানো দরকার।
তবে বিমানবন্দরের স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম আরও গতিশীল হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন বিদেশফেরত যাত্রীরা। চীন থেকে গতকাল ঢাকায় আসা যাত্রী হাসিনুর রহমান বলেন, চীনের গুয়াংডং প্রদেশের ফোশান সিটি থেকে গুয়াংজু বিমানবন্দরে আসতে প্রায় এক ঘণ্টা সময় লাগে। হাইওয়ের টোল দেওয়ার আগে পুলিশ সদস্যরা মাস্ক ও গ্লাভস পরে হ্যান্ডহেল্ড থার্মোমিটারে সব যাত্রীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা (জ্বর রয়েছে তা দেখেন) করেন। সেখানকার বিমানবন্দরেও পাঁচ দফা স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়। তিনি বলেন, শাহজালাল বিমানবন্দরে শুধু স্বাস্থ্যকর্মীরা মাস্ক ও গ্লাভস পরে আছেন। অন্যান্য সংস্থার কর্মীদের ক্ষেত্রে সেটি দেখা যাচ্ছে না।
চীন থেকে সরাসরি আসা ফ্লাইটের যাত্রীদের আলাদা করে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো প্রয়োজন বলে মনে করেন গতকাল দুবাই থেকে আসা এমিরেটস এয়ারলাইনসের যাত্রী জুমানা হোসেন। তিনি বলেন, শাহজালাল বিমানবন্দরে চীন থেকে আসা যাত্রীদের সঙ্গে অন্যান্য দেশ থেকে আসা যাত্রীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও ইমিগ্রেশন কার্যক্রম চলছে। এটি আলাদা করা উচিত বলে মনে করেন তিনি।
এ ব্যাপারে সিভিল এভিয়েশনের (বেবিচক) চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মোহাম্মদ মফিদুর রহমান বলেন, চীন থেকে সরাসরি আসা ফ্লাইটগুলোকে বোর্ডিং ব্রিজ দেওয়া হচ্ছে না। এসব ফ্লাইটের যাত্রীদের বিশেষ পথ দিয়ে সম্পূর্ণ আলাদাভাবে বিমানবন্দরের ভেতরে স্বাস্থ্য পরীক্ষাসহ আনুষঙ্গিক কার্যক্রম করানো হচ্ছে।
এদিকে বিশেষ সতর্কতা জারির পর ২১ জানুয়ারি থেকে গতকাল সকাল পর্যন্ত হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে চীন থেকে সরাসরি ফ্লাইটে আসা মোট ৮ হাজার ৩৯৬ যাত্রীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়েছে।
শাহজালাল বিমানবন্দরে যাত্রীদের শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণের পর প্রয়োজনে হাসপাতালে স্থানান্তরের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। এ পর্যন্ত দুজন যাত্রীর শরীরে জ্বর থাকায় বিমানবন্দর থেকে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। রক্তের নমুনাসহ আনুষঙ্গিক পরীক্ষায় তাঁদের শরীরে করোনাভাইরাসের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।
শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর
চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে চারজনের একটি চিকিৎসা দল পালা করে স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য কাজ করছে। থার্মোমিটার ব্যবহার করে তাঁরা যাত্রীদের জ্বর পরীক্ষা করেন। তবে কোনো থার্মাল স্ক্যানার নেই এখানে।
জেলা সিভিল সার্জন শেখ ফজলে রাব্বি বলেন, শাহ আমানত বিমানবন্দরে একটি থার্মাল স্ক্যানার ছিল, সেটি নষ্ট হয়ে গেছে। চীন থেকে সরাসরি কোনো ফ্লাইট চট্টগ্রামে যাওয়া–আসা করে না। যাত্রীদের মূলত ঢাকায় স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়। এরপরও জ্বরে আক্রান্ত কাউকে সন্দেহ করা হলে মেডিকেল দলকে জানানো হয়।
ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর
সিলেটে ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অস্থায়ী মেডিকেল ক্যাম্প বসানো হয়েছে। যেসব রোগী জ্বর ও কাশি নিয়ে বাংলাদেশ প্রবেশ করছেন, কেবল তাঁদেরই স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হচ্ছে।
সিলেটের সিভিল সার্জন প্রেমানন্দ মণ্ডল বলেন, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা জোরদার করেছেন তাঁরা।
প্রথম আলো