ডা. মোহাম্মদ জাহিদুর রহমান খান : ১৯৯৮ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগে ইন্সটিটিউট অফ পোস্ট গ্র্যাজুয়েট মেডিসিন অ্যান্ড রিসার্চের (আইপিজিএমআর) নাম পরিবর্তন করে জাতির জনকের নামানুসারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) করার মাধ্যমে দেশের প্রথম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় যাত্রা শুরু করে।
পরের বছর থেকেই এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে এমডি-এমএস রেসিডেন্সি প্রোগ্রাম শুরু হয়। কিন্তু পাকিস্তানি মনোভাবাপন্নদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ কলেজ অফ ফিজিশিয়ান অ্যান্ড সার্জনস (বিসিপিএস) থেকে এফসিপিএস ডিগ্রিধারী ব্যক্তিরা জাতির পিতার নামে স্থাপিত এ প্রতিষ্ঠানকে কখনই মন থেকে মেনে নিতে পারেনি।
বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায় আসামাত্র তাদের ইন্ধনে এমডি-এমএস রেসিডেন্সি প্রোগ্রাম চিরতরে বন্ধ করে দেয়া হয়। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ পুনরায় সরকার গঠন করার পর বিএসএমএমইউ’র তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ডা. প্রাণ গোপাল দত্তের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় পুনরায় এমডি-এমএস রেসিডেন্সি প্রোগ্রাম চালু হয়।
দুঃখজনক হলেও সত্য, অধ্যাপক ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত উপাচার্যের পদ থেকে অবসর গ্রহণের পর বিসিপিএসকেন্দ্রিক অশুভ চক্রটি পুনরায় সক্রিয় হয়ে ওঠে। ফলে দ্বিতীয়বারের মতো চালু হওয়ার কয়েক বছরের মধ্যেই এমডি-এমএস রেসিডেন্সি প্রোগ্রাম মুখ থুবড়ে পড়েছে। এ রকম দুঃখজনক পরিস্থিতিতে এই কোর্সের একজন সাবেক শিক্ষার্থী হিসেবে কিছু লেখার প্রয়োজনবোধ করছি।
গত কয়েক বছরে বিএসএমএমইউসহ এর অধীনে পরিচালিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অনুষ্ঠিত এমডি-এমএস রেসিডেন্সি প্রোগ্রামের বিভিন্ন বিষয়ের ফাইনাল পরীক্ষায় পাসের হার ব্যাপকভাবে কমে গেছে। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন বিষয়ে শতভাগ পরীক্ষার্থীকে ফেল করানো হয়েছে।
ইতিমধ্যে বহু শিক্ষার্থী কোর্স আউট হয়ে গেছেন অথবা কোর্স আউট হওয়ার হুমকিতে রয়েছেন। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, এই কোর্সের অধিকাংশ শিক্ষক ও পরীক্ষকের কোর্স কারিকুলাম সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা নেই। শিক্ষার্থীদের নিয়মিত ক্লাস নেয়া এবং রোগীর পাশে গিয়ে হাতে-কলমে শেখানোর ক্ষেত্রে তারা মোটেই আন্তরিক নন।
অফিস চলাকালীন প্রায়ই তাদের বিসিপিএসের কার্যক্রম নিয়ে ব্যস্ত থাকতে দেখা যায়, যার বিনিময়ে তারা মোটা অঙ্কের সম্মানী পেয়ে থাকেন। একজন শিক্ষার্থী টানা ৫-৭ বছর পড়াশোনা করার পরও পাস করতে ব্যর্থ হওয়ায় কোর্স থেকে চিরতরে বাদ পড়ে যাচ্ছে।
অথচ সে এই দীর্ঘ সময়টুকু যে শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে ছিল, সেই শিক্ষককে কোনো ধরনের জবাবদিহি করতে হচ্ছে না।
এমডি-এমএস রেসিডেন্সি প্রোগ্রামের ফাইনাল পরীক্ষায় পরীক্ষক নির্বাচনের ক্ষেত্রেও চরম অরাজকতা বিরাজ করছে। বিভিন্ন বিভাগে পর্যাপ্ত অধ্যাপক থাকার পরও হাতেগোনা কয়েকজন পরীক্ষক বছরের পর বছর ধরে পরীক্ষা নিয়ে যাচ্ছেন।
পরীক্ষক নির্বাচনে যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতাকে প্রাধান্য না দিয়ে ব্যক্তিগত পছন্দকে প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে, অধ্যাপককে উপেক্ষা করে সহযোগী অধ্যাপককে পরীক্ষক বানানো হচ্ছে। যারা এফসিপিএস পরীক্ষা নিয়ে অভ্যস্ত, তাদের কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ ছাড়াই হুট করে এমডি-এমএসের পরীক্ষক হিসেবে নির্বাচন করা হচ্ছে।
পরীক্ষার খাতা পুনরায় মূল্যায়নের সুযোগ না থাকার ফলে একজন রেসিডেন্টের বারবার অকৃতকার্য হওয়ার প্রকৃত কারণ জানা যাচ্ছে না। ফাইনাল পরীক্ষার সময় একজন শিক্ষার্থীর সারা বছরের পারফরম্যান্সকে (লগবুক) গুরুত্ব না দেয়ার কারণে তার মেধা ও দক্ষতাকে সার্বিকভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে না।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরে গত এক দশকে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে অভূতপূর্ব উন্নয়ন হয়েছে। গত এক দশকে সর্বোচ্চসংখ্যক চিকিৎসক সরকারিভাবে নিয়োগ পেয়েছে। বাংলাদেশের চিকিৎসকদের মেধা ও কর্মদক্ষতা বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত।
অথচ বিসিপিএস নামক প্রতিষ্ঠানটির একগুঁয়েমি ও হঠকারী মনোভাবের কারণে এফসিপিএস ডিগ্রি পাকিস্তান ছাড়া আর কোনো দেশে স্বীকৃত নয়। এমডি-এমএস রেসিডেন্সি প্রোগ্রামের কোর্স কারিকুলাম আন্তর্জাতিক মানের হলেও শিক্ষকদের দক্ষতা, আন্তরিকতা ও লবিংয়ের অভাবে এটি এখনও বহির্বিশ্বের কোনো দেশে স্বীকৃতি লাভ করেনি।
প্রধানমন্ত্রী সবসময় বিভিন্ন বিষয়ের শিক্ষার্থীদের উন্নত প্রশিক্ষণ এবং উচ্চতর গবেষণায় অংশ নিতে উৎসাহ দিয়ে থাকেন। অথচ শিক্ষকদের অবহেলার কারণে এমডি-এমএস রেসিডেন্সি প্রোগ্রামের শিক্ষার্থীরা এই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এ কোর্সের অধিকাংশ গবেষণা মানসম্মত না হওয়ার কারণে সেগুলো আন্তর্জাতিক মানের জার্নালসমূহে প্রকাশিত হচ্ছে না।
সম্প্রতি সরকারি চিকিৎসকদের জন্য ডেপুটেশন কিংবা শিক্ষা ছুটি গ্রহণের সুযোগ কমিয়ে দেয়া হয়েছে। বর্তমানে তারা পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন কিংবা ফেলোশিপ সম্পন্ন করার জন্য একবারই ডেপুটেশন পান। সুতরাং একজন সরকারি চিকিৎসকের কোর্স আউটের সঙ্গে সঙ্গে তার পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন কিংবা ফেলোশিপ সম্পন্ন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
বেসরকারি ডাক্তারদের অবস্থা আরও করুণ। নামমাত্র মাসিক ভাতার বিনিময়ে একটি বিষয়ে কয়েক বছর পড়াশোনা করে ফাইনাল পরীক্ষায় বারবার অকৃতকার্য হতে থাকলে বেশিরভাগ চিকিৎসক পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করার সামর্থ্য ও আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। এ কোর্সের সময়কালকে ‘পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন ট্রেনিং’ হিসেবে বিবেচিত না হওয়ার কারণে তার জন্য ডিপ্লোমা বা ফেলোশিপ সম্পন্ন করাও দুরূহ হয়ে পড়ে।
এমডি-এমএস রেসিডেন্সি প্রোগ্রামের নীতিমালা অনুযায়ী একজন পরীক্ষার্থী কেবল একটি বিষয়ে ভর্তি পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ পান। ভর্তি পরীক্ষায় বিষয়ভিত্তিক অপেক্ষমাণদেরও কোনো তালিকা প্রকাশ করা হয় না। কোনো কারণে একজন পরীক্ষার্থী নির্ধারিত বিষয়ে ভর্তি না হলে তার আসনটি শূন্যই থেকে যায়। ফলে আসন শূন্য থাকার পরও অনেক চিকিৎসক এ কোর্সে ভর্তি হতে ব্যর্থ হন।
প্রতি বছর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে এমডি-এমএস রেসিডেন্সি প্রোগ্রামে কয়েক হাজার চিকিৎসক ভর্তি হচ্ছেন। দুঃখজনক হলেও সত্য, তাদের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে কোনো আবাসন ব্যবস্থা নেই।
এর ফলে রেসিডেন্টরা, বিশেষ করে নারী চিকিৎসকরা প্রতিনিয়ত নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। বিএসএমএমইউ’র পক্ষ থেকে বেসরকারি রেসিডেন্টদের মাসিক ভাতা হিসেবে যে পরিমাণ টাকা দেয়া হয় সেটিও অপ্রতুল।
কোর্স চলাকালীন সব ধরনের প্রাইভেট প্র্যাকটিস নিষিদ্ধ থাকায় এবং ভর্তি পরীক্ষার ফি, কোর্স ফি এবং ফেইজ এ ও ফেইজ বি পরীক্ষার ফি অতিরিক্ত হওয়ায় একজন রেসিডেন্টকে আর্থিক সংকটে পড়তে হয়।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এমডি-এমএস রেসিডেন্সি প্রোগ্রামের একজন সাবেক শিক্ষার্থী হিসেবে কোর্সটিকে ধ্বংস হয়ে যাওয়ার হাত থেকে রেহাই দিতে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব উপস্থাপন করছি।
১. সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তসাপেক্ষে গত কয়েক বছরের এমডি-এমএস রেসিডেন্সি প্রোগ্রামের বিভিন্ন পরীক্ষার ফলাফল বিপর্যয়ের প্রকৃত কারণগুলো উদঘাটন করা এবং সেই অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা। ২. এমডি-এমএস রেসিডেন্সি প্রোগ্রামের শিক্ষক ও পরীক্ষকদের জন্য একটি পরিপূর্ণ, যুগোপযোগী নীতিমালা প্রণয়ন করা। ৩. এমডি-এমএস, রেসিডেন্সি প্রোগ্রামে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের একটি গ্রহণযোগ্য তালিকা প্রণয়ন এবং জ্যেষ্ঠতা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে পরীক্ষক নির্বাচন করা।
৪. এমডি-এমএস রেসিডেন্সি প্রোগ্রামে সম্পৃক্ত সব শিক্ষকের কোর্স কারিকুলাম সম্পর্কে নিয়মিত প্রশিক্ষণ প্রদান করা। ৫. বিশেষ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার খাতা পুনরায় মূল্যায়নের সুযোগ প্রদান করা। ৬. শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে একটি মানসম্মত পদ্ধতির মাধ্যমে শিক্ষক ও পরীক্ষক মূল্যায়নের ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
৭. এমডি-এমএস রেসিডেন্সি প্রোগ্রামের মাধ্যমে অর্জিত এমডি-এমএস ডিগ্রির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা। ৮. এমডি-এমএস রেসিডেন্সি প্রোগ্রাম সম্পৃক্ত যেসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক সংকট রয়েছে, সেই প্রতিষ্ঠানগুলোতে জরুরি ভিত্তিতে পর্যাপ্তসংখ্যক শিক্ষক নিয়োগ বা পদায়নের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
৯. এমডি-এমএস রেসিডেন্সি প্রোগ্রাম সম্পৃক্ত যেসব প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও শিক্ষা উপকরণ নেই, সেই প্রতিষ্ঠানগুলোর অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও পর্যাপ্ত পরিমাণ শিক্ষা উপকরণ সরবারহ নিশ্চিত করা। ১০. এমডি-এমএস রেসিডেন্সি প্রোগ্রামের ভর্তির ক্ষেত্রে পরীক্ষার্থীদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাছাইয়ের পাশাপাশি বিষয় বাছাইয়ের সুযোগ দেয়া। ১১. এমডি-এমএস রেসিডেন্সি প্রোগ্রামের ভর্তি পরীক্ষায় প্রতি বিষয়ে আলাদা করে অপেক্ষমাণ তালিকা প্রকাশ করা।
১২. এমডি-এমএস, রেসিডেন্সি প্রোগ্রামের সময়কালকে ‘পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন ট্রেনিং’ হিসেবে স্বীকৃতি দান করা। ১৩. এমডি-এমএস রেসিডেন্সি প্রোগ্রামের ভর্তি পরীক্ষার ফি, কোর্স ফি এবং ফেইজ এ ও ফেইজ বি পরীক্ষার বর্তমান ফি ৪০ শতাংশ হ্রাস করা। ১৪. এমডি-এমএস, রেসিডেন্সি প্রোগ্রামের রেসিডেন্টদের বর্তমান মাসিক ভাতা ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি করা এবং তাদের জন্য পর্যাপ্ত আবাসনের ব্যবস্থা করা।
ডা. মোহাম্মদ জাহিদুর রহমান খান : সহকারী অধ্যাপক, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ, ঢাকা