চীনে নতুন নিউমোনিয়া সদৃশ রহস্যময় করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে এখন পর্যন্ত ৪১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়াও এই ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা অন্তত এক হাজার ছড়িয়েছে। বিশ্ব জুড়ে ভাইরাস সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া নিয়ে চরম উদ্বেগ ও শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। এরই মধ্যে চীনের বেশ কয়েকটি প্রদেশে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে। এই কারণে সেখানকার প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক বিরাজ করছে।
বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে জানা যায়, অনেক প্রবাসীই বাংলাদেশে ফিরে আসার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু চীন সরকার সেখানকার সব ধরনের গণপরিবহনে চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে। এমন অবস্থায় একপ্রকার আটক অবস্থায় দিন কাটাতে হচ্ছে তাদের। তবে ভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও বাংলাদেশ দূতাবাস।
করোনাভাইরাস সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে চীনা মানচিত্রের কেন্দ্রে থাকা হুবেই প্রদেশের রাজধানী উহানের বাসিন্দারা। এছাড়া উহানের আশেপাশের ১৩টি শহরে ছড়িয়ে পড়েছে প্রাণঘাতী ভাইরাসটি।
এদিকে, কয়েকজনের মৃত্যুর ঘটনায় চাপা আতঙ্কের মধ্যে আছেন সেখানে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিরা। তাদের একজন শামিমা সুলতানা, যিনি গত চার বছর ধরে তার দুই সন্তান নিয়ে উহান শহরে বসবাস করছেন। প্রতিনিয়ত আতঙ্কের মধ্যে তিনি বাংলাদেশে ফিরে আসতে চাইলেও শহরটির সব গণপরিবহন চলাচলে নিষেধাজ্ঞা থাকায় সেটাও সম্ভব হচ্ছে না।
শামিমা সুলতানা বলেন, খুবই উদ্বেগ, আতঙ্ক আর মানসিক চাপের মধ্যে আছি। বাজার করার জন্যও বাইরে যেতে পারছি না। যে খাবার দাবার আছে, সেটা শেষ হলে কি করবো জানি না। এখন যদি বাংলাদেশে ফেরার কোনো সুযোগ থাকতো আমি এক মুহূর্তও এদেশে থাকতাম না। কিন্তু বাস, বিমান, ট্রেন সবই বন্ধ। ফেরার কোনো পথ নেই।
উহানের একটি প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ শাকিল আহমেদ। তিনি শুরুতেই অনেকটাই উদ্বেগের মধ্যে ছিলেন। কিন্তু উহান শহরে বসবাসরত অন্যান্য শিক্ষার্থীরা শুরুতে ভাইরাসের আতঙ্কে থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এবং বাংলাদেশ দূতাবাসের পক্ষ থেকে তাদেরকে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়ায় উদ্বেগ কিছুটা কমেছে। তিনি বলেন, দূতাবাস থেকে আর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সব সময় আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বলেছে যেন আমরা প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে বের না হই। সব সময় যেন মাস্ক পরি। তারা ওই মাস্কও দিয়েছে। বারবার হাত ধুতে বলেছে, প্রচুর পানি খেতে বলেছে। মানে যতভাবে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। তারা রুমে রুমে এ সংক্রান্ত নোটিশ দিয়ে গেছে।
মোহাম্মদ শাকিল আহমেদ বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সার্বক্ষণিক খোঁজ নেওয়া হচ্ছে যে আমরা ঠিক আছি কিনা। তারপরও যদি কারো মধ্যে করোনাভাইরাসের লক্ষণ দেখা যায় তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অ্যাম্বুলেন্স করে আক্রান্ত ব্যক্তিকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করবে। আসলে সাবধানে থাকা আর নির্দেশনা মেনে চলা ছাড়া আমাদের আর কোন উপায় নেই।
করোনাভাইরাসের এই বিস্তারকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে মোকাবিলার কথা জানিয়েছে চীনের বাংলাদেশ দূতাবাস। বর্তমান পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে উহানে বসবাসরত দুই শতাধিক বাংলাদেশি এরই মধ্যে এক হয়ে তাদের সমস্যাগুলোর কথা দূতাবাসকে জানিয়েছে। দূতাবাসের পক্ষ থেকেও সব বাংলাদেশি নাগরিককে জরুরি প্রয়োজনে যেকোনো সহায়তা চাওয়ার জন্য সপ্তাহে ২৪ ঘণ্টার একটি হটলাইন নম্বরে যোগাযোগের জন্য বলেছে।
বিশেষ করে কেউ অসুস্থ হলে দূতাবাসের পক্ষ থেকেই তাকে অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেওয়া হবে। যদিও এখন পর্যন্ত কোনো বাংলাদেশি বা বিদেশি নাগরিকের এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি।
মানুষের আতঙ্ক দূর করতে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে দূতাবাস যৌথভাবে কাজ করছে বলে জানান চীনে বাংলাদেশি দূতাবাসের ডেপুটি চিফ অব মিশন মাসুদুর রহমান। তিনি বলেন, আমরা বুঝতে পারছি যে, উহানের বাংলাদেশিরা যে একপ্রকার আটক হয়ে অসহায় অবস্থায় আছে। চীনা সরকার এখনও যেহেতু কাউকে সরিয়ে নেওয়ার কোনো নির্দেশনা দেয়নি, তাই আমরা সেটা করতে পারছি না। এখন চীনা স্বাস্থ্যসেবা অধিদপ্তর বা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে যে পরামর্শ দিচ্ছে সেগুলো মেনে চলতে বলছি।
মাসুদুর রহমান আরো বলেন, এছাড়া আমরা যে হটলাইন নম্বর চালু করেছি, সেখানে প্রতিদিন প্রচুর ফোন আসে। কারো বাসায় বাজার নেই, সে কিভাবে যাবে। কিন্তু কেউ আক্রান্ত হয়েছে এমন খবর আমরা পাইনি।