ডা. মা’রুফ রায়হান খান : একটা হসপিটালের যে মানুষগুলোর জন্য আমার সবচেয়ে বেশি খারাপ লাগে, মায়া লাগে তারা হচ্ছেন ইন্টার্ন চিকিৎসকগণ৷ মাত্র একজন মিডলেভেলের সাথে কখনও একা কখনও দুজন মিলে পুরো একটা ডিপার্টমেন্ট/ একটা ইউনিট চালানো কোনো মুখের কথা না। এই নতুন রোগী এলো রিসিভ করা, মিডলেভেলকে দেখানো, ইনভেস্টিগেশান পাঠানো, ট্রিটমেন্ট লেখা, ওদিকে আরেক রোগীর অবস্থা ক্রিটিক্যাল, দৌড়ে যাওয়া…একজন মারা গেছেন ডেথ সার্টিফিকেট লেখা, আমার রোগীর এই সমস্যা ওই সমস্যা, রিপোর্ট এসেছে রিপোর্ট ইন্টারপ্রিট করা…আমার রোগী আগে দেখে দিবেন, তাগড়া জোয়ান মানুষ রোগীর মানুষ এসে বলবে আমার প্রেশার মেপে দিন, রোগীর ৫/১০ জন লোক আলাদা আলাদা করে জানতে চাইবে তাদের রোগীর কী অবস্থা, হার্ট এটাক তো সকালে হয়েছে বিকেলেই বাসায় নিয়ে যাওয়া যাবে কি না, ব্যথা কমেছে কিন্তু রোগী এখনও দুর্বল কেন…একটা মিনিটের জন্য তারা কি অবসর পায়?
তাদের স্ট্রেসড হবার সবচেয়ে বড় যে কারণটি আমার কাছে মনে হয় সেটি হচ্ছে তারা যাদের সাথে ডিল করে তাদের একটা বড় অংশ অশিক্ষিত, মূর্খ, গোঁয়ার, ক্ষমতার চোখ রাঙাতে উদ্বাহু, স্বার্থপর এবং হুজুগে। আপনি হয়তো বলতে পারেন আমার মতো পজিটিভ মানুষ কিভাবে এগুলো বলছে। আমি দীর্ঘদিনের অবজারভেশন থেকে নিরপেক্ষতা বজায় রেখেই বলছি। আপনি যদি প্রতিদিন আমার চেয়ে বেশি সংখ্যক বাংলাদেশির সাথে ডিল না করে থাকেন তাহলে আমার কথাটা চোখ বুজে বিশ্বাস করতে পারেন। হসপিটালে এলেই একটা বড় সংখ্যক মানুষের হুমকি-ধমকি, ক্ষমতা দেখাতে চাওয়ার প্রবণতা বেড়ে যায়। একটা রোগী যখন আসে তার সাথে ৮/১০/১২ জন লোক সাথে আসা একেবারেই কমন। ডাক্তার যখন রোগীটাকে দেখছে তখন এই ৮-১২ জন ডাক্তারের কাঁধের উপর নিঃশ্বাস ফেলছে, গায়ে গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে, একেকজন একেকরকম কমেন্ট করছে এরমধ্যেই তার রোগীটা দেখতে হচ্ছে। আপনি যে কাজটাই করেন না কেন জাস্ট ইমাজিন করুন ১০-১২ জন লোক আপনার সাথে এভাবে দাঁড়িয়ে আছে, আপনি কি কখনও স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারবেন? আপনার মেজাজ খারাপ হবে তাই তো? সরে যেতে বলবে? বললেই কি সরে যাবে! কখনও না। উল্টো ডাক্তারের ব্যবহার খারাপ বলে আলোচনা হবে।
একটা রোগীর অবস্থা যখন খুব খারাপ হয়ে যেতে থাকে, মৃতপ্রায় অবস্থা তখন শুধু সেই ওয়ার্ড কেন মনে হয় অন্য ওয়ার্ড থেকেও মানুষজন এসে একদম গোল করে দাঁড়িয়ে যায়। প্রতিবার ক্রিটিক্যাল রোগীটার কাছ পর্যন্ত যেতে বেশ কসরত করতে হয় এবং বিলম্ব হয়। এবং এই ৫০-৬০ জন মানুষের সামনেই রোগীর বুকে চাপ দিতে হয়, শক দিতে হয়, ইমার্জেন্সি ইনজেকশান দিতে হয়…চিন্তা করুন একটা মেয়ে ডাক্তার মাটিতে হাঁটু গেড়ে রোগীর ব্লাড প্রেশার দেখছে আর এতোগুলো পুরুষ তাকিয়ে আছে…কেমন একটা মানসিক চাপের ব্যাপার? তবুও এই ডাক্তারকে ‘শিশটার’ ডাকবে, ‘বেডি’ ডাকবে, ‘আপনি কি ডাক্তার না ইন্টার্নি করতাসুইন?’, ‘বিয়া অইসে?’ এবং সেই মরণাপন্ন রোগীর সামনে নানাজন নানা ধরনের গা জ্বালা করা কমেন্ট করতে থাকবে, বিজ্ঞ মতামত দিতে থাকবে, ‘মাইরা ফালাইলো’ বলবে, অতি উৎসাহে মৃত্যুর ঘোষণা দেখবে। আমি কাউকে অন্য রোগীর মৃত্যুতে দুঃখিত হতে দেখি না।
একটা মানুষ একটানা কতোক্ষণ কাজ করতে পারে আসলে?
১২/১৪/১৬ ঘণ্টা একটানা একটা মানুষ যদি এক মিনিট বিশ্রাম না পেয়ে এমন প্রতিকূল পরিবেশে কাজ করে যেতে থাকে তার কেমন লাগবে? সেও তো মানুষ। তারও তো ক্লান্তি-সীমাবদ্ধতা-রাগ-অভিমান আছে। আমি অনেক আগে থেকেই রোগীদের অধিকার নিয়ে ডক্টরস কমিউনিটিতে লিখি, ভালো আচরণের পক্ষে লিখি কিন্তু এখন আমি যদি কখনও শুনি যে ইন্টার্ন একটা ধমক দিয়েছে আমি কখনও তাকে দোষারোপ করি না। সে রোবট বা এলিয়েন না। সে মানুষ। ডাক্তাররাও মানুষ। তবে এটা বিশ্বাস রাখুন আপনার রোগীটার জন্য এই মানুষগুলো সর্বোচ্চ চেষ্টাটাই করে। তার কাছে তার রোগী সবচেয়ে বড় প্রায়োরিটি। সবচেয়ে ভালো চিকিৎসাটাই তারা দেন। তার কষ্টটা আসলে সে ছাড়া কেউ বোঝে না৷ তার পরিবারের সদস্যরাও না। পরিবার গর্ব করে আমার ছেলে/মেয়ে ডাক্তার কিন্তু কী কষ্টে-ক্লান্তিতে-বিরক্তিতে-টানা ডিউটিতে তার একেকটা দিন যায় এটা তারাও জানে না। আর এটা তার ডাক্তারি জীবনের সূচনা, সামনের পথটা আরও…থাক।
আপনাকে কাজ করতে হবে না জাস্ট একটা ইন্টার্নের সাথে পুরো একটা ইভিনিং বা নাইট বসে থাকবেন শুধু। সকালবেলা যদি আপনি শতভাগ হাসিমুখে থাকতে পারেন আপনাকে চাইনিজ খেতে নিয়ে যাব। আর আপনারা সরকারি হাসপাতালে ডাক্তারের যে এতো ক্রাইসিস এ নিয়ে কখনও প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন করেন না কেন? রাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ে দাবি জানান না কেন? এটা আমাকে খুব অবাক করে।
এই জাতিকে সবচেয়ে বেশি উপকৃত যারা করেন তারা এই মানুষগুলো। এই জাতির উচিত তাদের নিয়ে গর্ব করা, সর্বোচ্চ সম্মাননা দেওয়া। তাদের প্রতি একরাশ শ্রদ্ধা, ভালোবাসা আর শুভকামনা। আপনাদের প্রতিদানগুলো আল্লাহর কাছ থেকে পাবেন ইন শা আল্লাহ। একটু কষ্ট করে সহ্য করুন…