ডা: মুহিব্বুর রহমান রাফে : বিসিএস এক দিল্লীকা লাড্ডু।
ফাইনালি যারা গেজেটভুক্ত হলে, তাদের জন্য শুভেচ্ছা। অনেকের আকাঙ্ক্ষিত স্বপ্ন পূরণ হলো। হয়তো কারো কারো ভাবনায় এক নিশ্চিত জীবন। মধ্যবিত্তের এ স্বদেশে মাস শেষে ফিক্সড বেতন পাওয়াও বা কম কিসে, তাই না? ফ্ল্যাটের জন্য লোন; পেনশন; গ্রাচুইটি; প্রমোশন; সামাজিক মর্যাদা আর বায়বীয় গাড়ির লোভ। চাকুরী শেষে কোটি টাকার গ্রাচুইটি আর পেনশনের হাতছানি। মন্দ নয়?
অন্যদিকে চিকিৎসকদের জন্য নিশ্চিত জীবনের নিশ্চয়তা এখন সত্যিই কি বিসিএস এ আছে?
এডহক আর তেত্রিশের নিয়োগের পর ঘুষের রেট বেড়েছে; তদবির বেড়েছে; কনফ্লিক্টও বেড়েছে কারণ এটা ছিল বড় নিয়োগ। সব অফিসে এখন বায়োমেট্রিক। প্রমোশনেও বায়োমেট্রিক এর কপি দিতে হবে। ট্রেনিং পোস্টে তো এখনই হাহাকার। ডিগ্রী; ফাউন্ডেশনেও আসন সংখ্যায় হাহাকার। ৩৯ এর যোগদানের পরে আবার বুঝা যাবে; ছিয়াত্তরের মন্বন্তর কেমন ছিল। সুতরাং আরো বেশি দলাদলি; আরো বেশি তৈলমর্দন; ঘুষ বখশিসের নিশ্চিত হাতছানি।
হতাশার কথা বলছি না। সবই বাস্তবতা।
আজ বলে রাখি; একদিন মনে পড়বে।
সরকারী চাকুরী যদি প্যাশনই হয়; প্রিয় ৩৯:
মনে রাখতে হবে আমরা স্বেচ্ছায় স্বজ্ঞানে দেশের মানুষকে সার্ভিস দেবো বলেই দায়িত্ব নিয়ে সরকারি চাকরিতে ঢুকেছি। চাইলেও তো দু বছরের আগে আসতে পারছো না। সততা ও আন্তরিকতার আমাদের সবচাইতে বড় বল। প্রতিটি মানুষ আমার আত্মার আত্মীয়। যে উপজেলাতেই যাও, মন দিয়ে কাজ কর। আদৌ চাকুরী করবো কিনা? আগে জয়েন করে তারপর ভাবো।কিন্তু এ কয় বছরে উপজেলার TC,BC,PC, তে হারিয়ে যেওনা।
মনে রেখ; ডিগ্রী না হলে স্বাস্থ্য ক্যাডারে খাওয়া নেই। সমাজে দাম নেই, দলদারিতেও বেইল নাই। সো FCPS P-1 এর চেষ্টার সাথে MRCP ,MRCS এর প্রিপারেশন নয়, এর মধ্যে কমপ্লিট করে ফেল।
একবছর ট্রেনিং থাকলে MCPS টা দিয়ে ফেল।
চান্স পেলে MPH কর, বাইরের স্কলারশীপ এর জন্য প্লাস হবে। অথবা প্রশাসনিক লাইনে সারপ্লাস হবে। IELTS/OET করে ফেল। এক্সেল,পাওয়ার পয়েন্টে দক্ষতা বাড়াও, কাজে লাগবে। সরকারী ট্রেনিং পেলে মিস করোনা; দক্ষতা বাড়বে।
চেম্বার শুরু কর, আগেই হতাশ হয়োনা, কারণ চেম্বার একটি পাতন প্রক্রিয়ার নাম। ধীরে জমে।
প্লিজ; কোন কোম্পানি বা ডায়াগনস্টিক সেন্টার এর কাছে বিক্রি হয়ে যেওনা। বিশ্বাস করো, ওরা পেছনে গালি দেয়। গেজেটেড অফিসার হিসেবে নিজের ভাষা ও পোশাক মেইনটেন করা দরকার। রাষ্ট্রের স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও প্রতিষ্ঠান কি করে চলে দু’বছর এটি জেনে নেওয়ার চেষ্টা করবে। সিস্টেম শিখে গেলে সারা জীবন কাজে লাগবে। সি এল ছাড়া স্টেশন লিভ করবে না। লোকাল রাজনীতিবিদ ও প্রশাসনের সাথে সুগভীর সম্পর্ক অনেক কাজে দেবে। সমস্যা না হলে, বিয়ে করে বেবি নিয়ে ফেল। অল্প বয়সে ফ্ল্যাট/গাড়ি নয়, সঞ্চয় করার চেষ্টা কর; কাজে লাগবে। ফাউন্ডেশন ট্রেনিংটা সেরে ফেলবে।
যারা #রেসিডেন্সিতে এবার হলে;কর্তৃপক্ষের কাছে ভর্তিটা আগে নিয়ে ফেলার জন্য আবেদন করতে পারো। দিন শেষে শিক্ষকরা বড় মনের- এটাই আমাদের বিশ্বাস। ভর্তি হতে পারলে বা যারা ভর্তি আছো, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছুটিটা কনফার্ম করে নিও। দূরে থাকলেও ডিপার্টমেন্টের সব বাৎসরিক কনফারেন্সে থাকার ট্রাই করবে। চাকুরীর দুবছর হলে ডিপার্টমেন্টাল পরীক্ষাটা মাস্ট দেবে।
সরকারী চাকুরীতে যারা জয়েন করোনি বা বঞ্চিত হলে; দয়া করে পার্ট ১, ডিপ্লোমা এমফিল বা এমপিএইচ বা নভেম্বরের ২০২০ রেসিডেন্সি আর মার্চের ডিপ্লোমাটাকে একটু সিরিয়াসলি নাও। দিনশেষে ওটাই তোমার সম্পদ যা কেউ কেড়ে নিতে পারবে না।
ফিমেল চিকিৎসক, যাদের ফ্যামিলি; বেবি কনসার্ন; পরিবার বা হাজবেন্ড সলভেন্ট; ক্যারিয়ারকে এক নম্বরে রাখো। পীড়াদায়ক চাকুরী; বোনাস; সুবিধা; টাকা লিস্টে দ্বিতীয়।
#যাদের_এখনও_কিছুই_হয়নি;
পুরো জীবনটা নিয়ে ভেবেছো কখনও। কি পাবে? হয়তো আমাদের অনেকেই কেউ ভাবত;
একটি আরামের জীবন যেখানে সপ্তাহে দুদিন গেলেও হয়; বাকি সময় কিছু মাল কড়ি। ক্লিনিকে ধান্দা; ফার্মেসীতে বসে কিছু খসানো; ঔষধ কোম্পানীর সাথে সিস্টেম করে কিছু হাত খরচ জোগানো; সাতদিনে আল্ট্রা শিখে যখন-তখন কলে ১০০টাকার জন্য দৌড়ে যাওয়া; কিংবা একটা ভালো পোস্টিং এর জন্য হ্যাংলামো করে চাটুকারিতা আর তৈলমর্দন? অথচ ভুলে যাই আমি ডাক্তার, প্রথম শ্রেণির নাগরিক ও কর্মকর্তা।
বিসিএসই নিশ্চিত জীবন, ক্যারিয়ার নয়, যদি কারও ভাবনা হয়; দয়া করে কুলীন ক্যাডারে যাও। সিরিয়াসলি বলছি। ক্ষমতা; চেয়ার; পদমর্যাদা সবই পাবে। চিকিৎসক হিসেবে নিজের কম্যুনিটিকেও হেল্প করতে পারবে।
নিজের পেশায় সুনাম নিয়ে থাকতে চাও?
প্লিজ বেসিক পড়া আর ট্রেনিং এ ফাঁকি দিওনা। পরে ধরা খাবে। যার বাইরে যাবার সুযোগ বা ইচ্ছা আছে; এখন থেকেই ট্রাই কর।
বয়স আছে; আত্মীয়; সাপোর্ট আছে?
মাস্ট ট্রাই কর। ইন্টার্নীর সময়ে IELTS করে ফেল, টার্গেট ৭+। AMC, PLAB, GMC, USMLE ট্রাই কর। FCPS P-1 এর চেষ্টার সাথে MRCP, MRCS এর প্রিপারেশন নাও; কমপ্লিট করে ফেল। ফাও সার্টিফিকেট কোর্সের পেছনে টাইম লস কোরনা।
অথবা আর্মিতে যাও।
এক্সপার্ট চিকিৎসক হবার জন্য বিসিএস কোন শর্ত নয়। আর টাকা ইনকাম টার্গেট হলে #ব্যবসা কর।
কেউ কেউ বাহির থেকে হসপিটাল ম্যানেজমেন্টে ডিগ্রী করে এসে আন্তর্জাতিক মানের হসপিটাল, ক্লিনিক, ইন্সটিটিউট গড়ে তোল আর জ্ঞাতিভাইদের চাকুরী দাও। ভালো করবে। রিসার্চের বিশাল ফিল্ড যোগ্য লোকের অভাবে খাঁ খাঁ করছে।
দিন দিন সব কঠিন হয়ে আসছে। এ পেশায় দিন আরও কঠিন হবে। একদিকে জেলায় জেলায় ডাক্তার বানানোর কারখানা হবে; অন্যদিকে যোগান বাড়ায় চাহিদা কমে পণ্যের দাম কমতে থাকবে। তাতে কারও কিছু আসে যায়না। কারণ ডাক্তাররা সরকারী চাকুরীজীবি বা পেশাজীবি হিসাবে রাজনীতির মাঠে কোন ফ্যাক্টর নয়। বরং সুবিধাভোগী শ্রেনী। তার চেয়ে পরিবহণ শ্রমিকের রাজনৈতিক মূল্য অনেক বেশি। কারণ ওরা সংখ্যায় অগুণিত; মিছিল, ভাঙচুর করতে পারে, লাঠিয়াল হতে পারে।
দিন বদলাবে? দিন শেষে তার সম্ভাবনাও ক্ষীণ।আমাদের কম্যুনিটির সৌরজগতে সত্যিই সূর্যের বড় সংকট। যা আছে; সব স্নিগ্ধ আলো দেয়া চন্দ্র। নিজে তেজস্বী হয়ে জ্বলা বা জ্বালাবার চেয়ে অন্যের আলো নিয়ে রুপালী হয়ে থাকাই যেন সবার লক্ষ্য।
আমরা নিজের জন্য; দেশের জন্য আর মানুষের জন্য বড় হব; সমৃদ্ধ হব। ক্ষুদ্রতা, সাময়িক লাভ; সিদ্ধান্তহীনতা; ভুল সিদ্ধান্ত যেন জীবন থেকে আমাকে ছিটকে ফেলে না দেয়।
জীবন গোছাতে হবে চল্লিশের আগেই।
বিশ্বাস কর; স্বার্থপর এ সময়ে শেষ পর্যন্ত তোমাকে একাই লড়ে যেতে হবে। বিপদে সব কেটে পড়বে।
যা মনে আসল লিখলাম;
কারণ একজন ডাক্তারকেও হতাশ দেখলে খারাপ লাগে। জীবনটা তোমার; দিন শেষে প্রাপ্তি অপ্রাপ্তিও তোমারই। জীবনটা অনেক কিছুর জন্য। একটা চাকুরী, যেটা ছেড়ে দেয়া যায়, সেটি জীবনের একমাত্র সার্থকতা নয়। একরাশ শুভকামনা ও ভালোবাসা।
ডা: মুহিব্বুর রহমান রাফে
বিসিএস (স্বাস্থ্য)
এম.ডি (ফিজিক্যাল মেডিসিন)
কনসালটেন্ট,ফিজিয়াট্রিষ্ট এন্ড ইন্টারভেনশনিস্ট।