ডা. মো. শামীম আল মামুন: ইরা, ইরামনি, খুবই আদরের মেয়ে। বয়স চার বছরের কিছু বেশি। তার গালে হাত, চোখে পানি। এসেছে ডেন্টাল ক্লিনিকে, মা-বাবার সঙ্গে। মা চিকিৎসক। মা ডেন্টিস্টকে বললেন, কিছুদিন ধরে ইরামনির খাবার খেতে খুব অনীহা। গতকাল রাতে দাঁতের ব্যথায় কান্না করেছে। প্যারাসিটামল সিরাপ দেওয়া হয়েছিল। কিছুক্ষণ ব্যথা ছিল না, আবার শুরু হয়। ডেন্টিস্ট পরীক্ষা করে বললেন, ইরামনির নিচের চোয়ালের বাঁ পাশের ৪ নম্বর দুধদাঁতে বড় গর্ত। পালপেকটমি নামক চিকিৎসা করতে হবে। কিন্তু অনেকবার আসতে হবে। ভয় ছিল কাজ করতে দেয় কি না! প্রথম দিন একটু কাজ করতে দিল। ব্যথা কমে গেল। অনেক খুশি মনে ওই দিন সবাই ডেন্টাল চেম্বার ত্যাগ করলেন। পরবর্তী ভিজিট, ইরামনি কিছুতেই কাজ করতে দিল না। পরের কয়েক ভিজিট শুধুই আসা-যাওয়া। মা এবার কিছুটা বিরক্ত। মা বললেন, ‘ডাক্তার সাহেব, এভাবে তো কাজ করা খুবই মুশকিল। দাঁত ফেলে দেওয়া যায় না? এটা তো দুধদাঁত! এটা পড়লে তো আবার উঠবে! ফেলে দেন।’ এ তো গেল একজন চিকিৎসক মায়ের কথা। ডেন্টাল ক্লিনিকে এ রকম হাজারো প্রশ্ন। দুধদাঁত ফেলে দিলে কী হবে! দুধদাঁতের জন্য এত খরচ কেন করব? এ দাঁত তো পড়েই যাবে! এ লেখায় সেসব নিয়েই।
দুধদাঁতের চিকিৎসা কেন জরুরি
দুধদাঁতকে ইংরেজিতে ‘মিল্ক টিথ, টেম্পোরারি টিথ, প্রাইমারি টিথ, ডিসিডিয়াস টিথ’ বলে। কিন্তু শেষের নামটি বাদ দিলে বাকি নামগুলো যুক্তিসংগত নয়। ওই নামগুলো দ্বারা দাঁতের কম প্রয়োজনীয়তা প্রকাশ পায়। বাস্তবে দুধদাঁত স্থায়ী দাঁতের তুলনায় কোনো অংশে কম প্রয়োজনীয় নয়। দুধদাঁত একটি শিশুর শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক উন্নয়নের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। স্থায়ী দাঁতের মতোই দুধদাঁতের যত্ন নেওয়া প্রয়োজন। কারণ—
১. দুধদাঁত স্থায়ী দাঁতের জন্য স্থান সংরক্ষণ করে এবং স্থায়ী দাঁতকে সঠিক স্থানে আসতে সুযোগ করে দেয়। যদি কোনো কারণে দুধদাঁত আগে পড়ে যায় বা ফেলে দিতে হয়, তবে পাশের দাঁতগুলো খালি জায়গা পেয়ে ওই জায়গায় সরে আসে। এ কারণে স্থায়ী দাঁতের জন্য স্থান কমে যায়, স্থায়ী দাঁত আসতে অসুবিধা হয় অথবা স্থায়ী দাঁত মাড়ির ভেতর আটকা পড়তে পারে। এতে স্থায়ী দাঁত আঁকাবাঁকা হওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যায়।
২. স্থায়ী দাঁত দুধদাঁতের শিকড়ের খুব কাছাকাছি তৈরি হয়। অন্যদিকে, দুধদাঁত ছোট এবং এর বাইরের আবরণ পাতলা হওয়ায় দুধদাঁতে ক্যারিজ (গর্ত) হলে তা সহজে দন্ত মজ্জায় পৌঁছায় এবং এর শিকড় দিয়ে স্থায়ী দাঁতের কাছে ক্ষত তৈরি করে, যা পরবর্তী সময়ে স্থায়ী দাঁতকে আক্রান্ত করে এবং স্থায়ী দাঁতকে ক্ষতি করতে পারে। কাজেই স্থায়ী দাঁতের স্বাস্থ্যকর বিকাশের জন্য দুধদাঁত সুস্থ রাখা জরুরি।
৩. দাঁত খাবার চিবানোর জন্য প্রয়োজন, সেটা দুধদাঁত হোক অথবা স্থায়ী দাঁত। দুধদাঁতে গর্ত হলে বা শিশুর দুধদাঁতে ব্যথা হলে শিশু সঠিকভাবে খাদ্য চিবোতে করতে পারে না। এতে শিশুর শরীরে পুষ্টির অভাব দেখা দিতে পারে এবং শিশু সহজেই নানা রকম রোগে আক্রান্ত হতে পারে। এ ছাড়া যেহেতু ব্যথার প্রবণতা রাতেই বেশি হয়, তাই শিশু ঠিকমতো ঘুমোতে পারে না বলে সারা দিন শিশুর মেজাজ খিটমিটে থাকে।
৪. কথা বলার জন্য সঠিক শব্দ তৈরিতে সুস্থ দাঁত, জিব ও ঠোঁট প্রয়োজন। সঠিক স্থানে শিশুর দাঁতের উপস্থিতি কথা বলার সময় সঠিক উচ্চারণ গঠনে সাহায্য করে। এ ছাড়া দাঁত মুখের মাংসপেশির সাপোর্ট দেয় এবং মুখের সুন্দর আকৃতি দান করে।
৫. শিশুর দাঁত অসুন্দর হলে অনেক সময় ক্লাসে শিশু তার বন্ধুবান্ধব দ্বারা তামাশার পাত্রে পরিণত হয়। সে ক্ষেত্রে শিশু ক্লাসে মনোযোগী হতে পারে না। এতে লেখা পড়ায় পিছিয়ে পড়ে। শিশু অন্তর্মুখী হয়ে পড়ে।
এ কারণে—
দুধদাঁত স্থায়ী দাঁতের মতো সমান প্রয়োজনীয়
দুধদাঁতে কোনো কারণে সমস্যা হলে অতি গুরুত্বের সঙ্গে চিকিৎসা করা প্রয়োজন
সময়ের আগে দাঁত ফেলে দেওয়া সঠিক চিকিৎসা নয়
কোনো কারণে দুধদাঁত আগে ফেলে দিতে হলে ‘স্পেস মেইনটেইনার’ নামক ডিভাইস ব্যবহার করে স্থায়ী দাঁতের জন্য স্থান সংরক্ষণ করা প্রয়োজন
কোনো অবস্থাতেই দুধদাঁত বলে অবহেলা করা ঠিক নয়।
যেকোনো প্রয়োজনে ‘বিএমডিসি’র অধিভুক্ত ‘বিডিএস’ ডাক্তারের পরামর্শ গ্রহণ করুন।
ডা. মো. শামীম আল মামুন
কনসালট্যান্ট, অর্থোডন্টিকস বিভাগ
ল্যাবএইড কার্ডিয়াক হাসপাতাল