তানভীর সিদ্দিকী: দেশে দিন দিন অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। একইসঙ্গে বাড়ছে এ রোগে মৃত্যুর সংখ্যাও। মোট মৃত্যুর শতকরা ৬৭ শতাংশ মৃত্যুই হচ্ছে অসংক্রামক রোগে বা এনসিডিতে। এছাড়াও বিশ্বব্যাপী প্রায় চার কোটি ১০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয় অসংক্রামক রোগে। স্বল্প ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে বছরে ৩০ থেকে ৬৯ বছর বয়সী প্রায় দেড় কোটি মানুষের মৃত্যু হয় অসংক্রামক রোগে। যার ৮৫ শতাংশের বেশি হল ‘অকালমৃত্যু’।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খাদ্যাভ্যাস ও জীবনাচারের পরিবর্তন, দ্রুত নগরায়ণ, ধূমপান, প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের প্রসার, বায়ুদূষণ, মানসিক চাপের কারণে অসংক্রামক রোগের প্রকোপ বাড়ছে।

বুধবার (২৭ নভেম্বর) রাজধানীর হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টালে ‘অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের জন্য বহুখাতভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা ২০১৮-২৫’ এর জাতীয় পর্যায়ের অবহিতকরণ সভায় এসব কথা বলেন বক্তারা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ কর্মসূচির উদ্যোগে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থসেবা বিভাগের তত্ত্বাবধানে ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহযোগিতায় এ সভা অনুষ্ঠিত হয়।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. জাহিদ মালেক বলেন, বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশমতে অসংক্রামক রোগের ঝুঁকির কারণ হলো তামাক সেবন, ধূমপান, অস্বাস্থ্যকর তৈলাক্ত খাবার, অতিরিক্ত লবন, শারীরিক অলসতা, মদপান ইত্যাদি। এসব যদি কারো জীবনাচরনে বিদ্যমান থাকে, তাহলে তাদের মধ্যে এই রোগগুলো হবার প্রবণতা বেড়ে যায়।

তিনি বলেন, এই দীর্ঘমেয়াদী রোগগুলো একবার হয়ে গেলে তা সারাজীবন থাকে, তাই রোগ নিরাময়ের পরিবর্তে আমাদের রোগ প্রতিরোধের ওপর গুরুত্বরোপ করা উচিত। আর এসব ঝুঁকির কারণগুলো নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি সরকারের স্বাস্থ্য ভিন্ন অন্যান্য খাতের ওপর নির্ভরশীল। প্রণয়নকৃত ‘বহুখাতভিত্তিক এই কর্মপিরিকল্পনা এই ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের কার্যক্রমের মূল বুনিয়াদি নকশা হিসাবে বিবেচিত হবে।

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. এএইচএম এনায়েত হোসেন। তিনি বলেন, ডায়াবেটিস, ক্যানসার, হৃদরোগ, ফুসফুস, কিডনি রোগ ইত্যাদিতে এই মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে।

আর আগে মানুষ বেশি মারা যেত ছোঁয়াছে রোগ কলেরা, টাইফয়েড ইত্যাদিতে। ২০১১ সালে অসংক্রামক রোগে মারা গেছে ৫২ শতাংশ, ২০১৪ সালে ৫৯ শতাংশ। আর এই সংখ্যা ২০১৭ সালে এসে দাঁড়ায় ৬৭ ভাগ। জীবনযাত্রার ধরন তথা লাইফ-স্টাইল পরিবর্তনের সূত্র ধরে রোগের ধরনে গুণগত পরিবর্তন এসেছে। তাই অসংক্রামক রোগ থেকে বাঁচতে মানুষকে সচেতন হওয়ার আহবান জানিয়েছেন এই বিশেষজ্ঞ। এই রোগের বিষয়ে মানুষের মানসিকতার পরিবর্তন দরকার। স্কুল থেকেই শারীরিক ব্যায়াম সম্পর্কে ধারণা দিতে হবে শিশুদের। আইনের বাধ্যবাধকতাও থাকতে হবে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে সকলের সমন্বয় প্রয়োজন। প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ, উপযুক্ত প্রযুক্তি, মনিটরিং ও মূল্যায়ন এবং গবেষণা দরকার।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক সমীক্ষায় দেখা যায় যে, যদি অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণের জন্য এক ডলার ব্যয় করা হয়, তবে ১০ বছর পর ৭ ডলার ফেরত পাওয়া যায়।

স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিব আসাদুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. জাহিদ মালেক।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন কমিউনিটি স্বাস্থ্য সহায়তা ট্রাস্টের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী, মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের সচিব শেখ ইউসুফ হারুন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। এছাড়াও অনুষ্ঠানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থার উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাবৃন্দ, শিক্ষাবিদ, সমাজকর্মী প্রমূখ উপস্থিত ছিলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *