তানভীর সিদ্দিকী: বিশ্বে প্রতি বছর ১ কোটি ৭৯ লাখ মানুষ হৃদরোগে মৃত্যুবরণ করে। যার মধ্যে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষ শিল্পোৎপাদিত ট্রান্স ফ্যাট গ্রহণের কারণে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। বাংলাদেশে প্রতি বছর বছর ২ লাখ ৭৭ হাজার মানুষ হৃদরোগের কারণে মারা যায়। এর অন্যতম কারণ হলো অস্বাস্থ্যকর খাদ্য গ্রহণ, যা প্রতিরোধযোগ্য।

এ বিষয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের অবহিত করতে রোববার (১৫ ডিসেম্বর) বেলা ১২টায় রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ ও গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটর বাংলাদেশের যৌথ আয়োজনে ট্রান্স ফ্যাট ও হৃদরোগের ঝুঁকি সংক্রান্ত এক আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন।

বক্তারা বলেন, খাদ্যদ্রব্যের মাধ্যমে ট্রান্সফ্যাট নামক একধরনের চর্বি জাতীয় পদার্থ ধমনির রক্ত প্রবাহ বন্ধ করে হৃদরোগজনিত মৃত্যুঝুঁকি তৈরি করে। মাত্রাতিরিক্ত ট্রান্স ফ্যাট গ্রহণ হৃদরোগ, স্ট্রোক ও টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বৃদ্ধি করে। ট্রান্সফ্যাট যুক্ত খাবার রক্তে ‘খারাপ’ কোলেস্টেরল কমিয়ে দেয় এবং মানুষকে অসুস্থ করে ফেলে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, সুস্বাস্থ্য নির্ভর করে সুষম ও পরিমিত খাদ্যের উপর। সুতরাং আমরা কি খাবার খাই, কতোটুকু খাই, সেটার উপর নজর রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একটা সময় সংক্রমক রোগ দ্বারা বেশি লোক মৃত্যু বরণ করতো। এখন আমরা নিয়ন্ত্রণে আনতে পেরেছি। বাংলাদেশ পোলিওমুক্ত, টিভি- ম্যালেরিয়ামুক্ত, আমরা এমডিজি অর্জন করেছি।

তিনি বলেন, একটা সময়ে আমাদের ব্যবস্থাপনাটাই ছিলো সংক্রমক রোগ নিয়ন্ত্রণ এবং চিকিৎসা প্রদান নিয়ে। কিন্তু ইদানীং আমাদের দেশে মৃত্যুবরণ যা ঘটে, তার ৬৫ শতাংশ হলো অসংক্রমক রোগে মারা যায়, যার মধ্যে ক্যান্সার, কিডনী, হার্ট, ডায়াবেটিস রয়েছে। কিন্তু এসব মৃত্যুর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৩০ শতাশং মারা যায় হার্টের রোগে। হার্টের কারণে শুধু বাংলাদেশেই নয়, সারা বিশ্বেই মারা যাচ্ছে। বিভিন্ন কারণেই এই হার্ট রোগ হয়ে থাকে, তারমধ্যে অন্যতম হলো, ট্রান্স ফ্যাট। এর পাশাপাশি আমাদের ব্লাড প্রেশার বেড়ে যাওয়া, অতিরিক্ত মোটা হয়ে যাওয়া, ওজন বেড়ে যাওয়াসহ হার্টের রোগের জন্য ধূমপান একটি বড় কারণ।

তিনি আরও বলেন, এখনি যদি আমরা সচেতন না হই, আমাদের ছেলেমেয়েদের সচেতন না করি, তাহলে এসব রোগ থেকে আমরাও বাঁচতে পারবো না, পরিবারকেও বাঁচাতে পারবো না। সুতরাং আমাদের উচিত ট্রান্স ফ্যাট কী, এর ভয়াবহতা কী এসব সম্পর্কে জানা এবং সবাইকে জানানো। শুধুমাত্র সচেতনতাই এসব ঝুঁকি থেকে আমাদেরকে বাঁচাতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় সাড়ে ৫ লাখ মানুষ ট্রান্স ফ্যাট গ্রহনের কারণে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। সাধারণত ভাজা পোড়া ও বেকারি খাবারে শিল্পোৎপাদিত ট্রান্সফ্যাট থাকে। ভেজিটেবল অয়েলের সাথে হাইড্রেজেন যুক্ত করলে তেল জমে যায় এবং ট্রান্সফ্যাট উৎপন্ন করে। এই পারশিয়াল হাইড্রোজেনেটেড অয়েল আমাদের দেশে ডালডা বা বনস্পতি ঘি নামে পরিচিত। ভাজাপোড়া খাদ্যে একই তেল উচ্চ তাপমাত্রায় বারবার ব্যবহারের কারণেও খাদ্যে ট্রান্সফ্যাট সৃষ্টি হয়।

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ অনুযায়ী, এহজন ব্যক্তির দৈনিক ট্রান্সফ্যাট গ্রহণের পরিমান হওয়া উচিত মোট খাদ্যশক্তির ১শতাংশের কম, অর্থাৎ দৈনিক ২০০০ ক্যালোরির ডায়েটে তা হতে হবে ২.২ গ্রামেরও কম।

কর্মশালায় বলা হয়, বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে ডেনমার্ক ২০০৩ সালে আইন করে খাদ্যদ্রব্যে ট্রান্স ফ্যাটের সর্বোচ্চ সীমা মোট ফ্যাটের ২ শতাংশ নির্ধারণ করে।

অস্ট্রিয়া, নরওয়ে, দক্ষিণ আফ্রিকা, থাইল্যান্ড, ইরান, ভারতসহ মোট ২৮টি দেশে খাদ্যদ্রব্যে ট্রান্স ফ্যাটের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ কার্যকর করায় এসব দেশে ইতোমধ্যে শিল্পোৎপাদিত খাদ্যে ট্রান্স ফ্যাটের পরিমাণ ব্যাপক হারে হ্রাস পেয়েছে।

এছাড়া আরও ২৪টি দেশ ট্রান্স ফ্যাট নিয়ন্ত্রণ বাধ্যতামূলক করেছে, যা আগামী দুই বছরের মধ্যে কার্যকর হবে বলেও বক্তারা জানান।

থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা ট্রান্স ফ্যাটের প্রধান উৎস অসম্পৃক্ত চর্বির উৎপাদন ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে।

ভারতে ২০১১ সাল থেকে তেল ও ডালডা জাতীয় পণ্যে ট্রান্স ফ্যাটের মাত্রা সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ পর্যন্ত বাধ্যতামূলক করা হয় এবং ২০১৫ সালে এটি ৫ শতাংশে কমিয়ে আনা হয়।

২০১৮ সালে ভারতের ফুড সেফটি অ্যান্ড স্টান্ডার্ডস অথরিটি ২০২২ সালের মধ্যে ট্রান্স ফ্যাটের সর্বোচ্চ মাত্রা ২ শতাংশে কমিয়ে আনার পাশাপাশি খাবারে শিল্পোৎপাদিত ট্রান্স ফ্যাট পরিহার করার ঘোষণাও দিয়েছে।

বাংলাদেশে এ ধরনের কোনো আইন বা উদ্যোগ না থাকায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন তারা।

বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টারস ফোরামের সভাপতি তৌফিক মারুফের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানের আলোচ্য বিষয় সম্পর্কে আলোচনা করেন ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের ইপিমেডিওলজি অ্যান্ড রিসার্চ বিভাগের অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী, গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটরের বাংলাদেশ কান্ট্রি কোঅর্ডিনেটর মুহাম্মদ রুহুল উদ্দিন এবং প্রজ্ঞা’র ট্রান্স ফ্যাট বিষয়ক প্রকল্পের টিমলিডার মো. হাসির শাহরিয়ার।

ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি জাতীয় অধ্যাপক ব্রিগেডিয়ার (অব) আব্দুল মালিকের সভাপতিত্বে এ আলোচনা সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থসেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব রীনা পারভীন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. এএইচএম এনায়েত হোসেনপুর, বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির সভাপতি অধাযাপক ডা. একে আজাদ খান, ক্যাব সভাপতি গোলাম রহমান, প্রজ্ঞার নির্বাহী পরিচালক এবিএম জুবায়ের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *