ডা. জাহিদুর রহমান : সম্প্রতি প্রান্তিক জনগণের চিকিৎসাসেবার মানোন্নয়ন এবং দেশের হাজার হাজার তরুণ, বেকার চিকিৎসকদের কথা বিবেচনা করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে স্বল্পতম সময়ের মধ্যে ৩৯তম বিশেষ বিসিএসের মাধ্যমে ৪৪৩৩ জন ডাক্তার নিয়োগ দেয়া হয়েছে।
৮ ডিসেম্বর সকালে স্বাস্থ্য অধিদফতরের পক্ষ থেকে বসুন্ধরা কনভেনশন হলে সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত চিকিৎসকদের যোগদান অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এরকম একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অনুপস্থিতি আমাদের হতবাক করেছে। অথচ একই দিন বিকালে প্রধানমন্ত্রী চলচ্চিত্র পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান এবং সন্ধ্যায় বিপিএল ২০১৯-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দীর্ঘক্ষণ উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্বাস্থ্য অধিদফতরের নীতিনির্ধারকদের গ্রহণযোগ্যতা কতটুকু, সেটি এ একটি ঘটনা থেকেই প্রমাণ হয়। আয়োজকরা কি তাদের অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানানোর প্রয়োজনবোধ করেননি? নাকি আমন্ত্রণ জানিয়ে রাজি করাতে ব্যর্থ হয়েছেন? ঢাকায় তিন বেলায় তিনটি পূর্বঘোষিত অনুষ্ঠানে যোগ দেয়া প্রধানমন্ত্রীর জন্য নতুন কিছু নয়। তাছাড়া যোগদান অনুষ্ঠানে আয়োজকরা যদি সত্যিই প্রধানমন্ত্রীকে উপস্থিত করানোর জন্য আন্তরিক হতেন, তাহলে অনুষ্ঠানের তারিখ আগে বা পরে সরিয়ে নেয়া যেত। সুতরাং প্রধানমন্ত্রীকে উপস্থিত করাতে ব্যর্থ হওয়ার দায়ভার সম্পূর্ণভাবে স্বাস্থ্য অধিদফতরকেই নিতে হবে।
গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের তরুণ ডাক্তারদের মন-মানসিকতায় আমূল পরিবর্তন এসেছে। তারা জানে উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্সে থাকার ভালো ব্যবস্থা না থাকলেও প্রতিদিন বায়োমেট্রিক হাজিরা দেয়ার মাধ্যমে তাদের কর্মস্থলে সার্বক্ষণিক উপস্থিত থাকতে হবে। তারা জানে এলাকার পাতি মাস্তান বা রাজনৈতিক নেতার হাতে চড় খেয়েও কমপক্ষে দু’বছর তাদের ইউনিয়ন বা উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালে চাকরি করতে হবে।
তারা জানে জরুরি চিকিৎসা আর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকলেও তাদের রোগী ভর্তি করা লাগবে। তারা জানে হাসপাতালে অক্সিজেন না থাকলে, অ্যাম্বুলেন্স নষ্ট থাকলে, এমনকি টয়লেট নোংরা হলেও তাদেরই দোষারোপ করা হবে। এরকম নানা ধরনের প্রতিকূলতা মোকাবেলা করার মানসিক শক্তি নিয়েই সম্প্রতি ৪ হাজার ৪৩৩ জন ডাক্তার সরকারি চাকরিতে যোগদান করেছেন। তারা আর এখন তাদের পূর্বসূরিদের দেখানো অন্ধকার পথে যেতে চান না।
সরকারি কর্মঘণ্টায় ভিজিট নিয়ে রোগী দেখা, কমিশনের জন্য রোগীকে অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানো, ওষুধ কোম্পানির কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা আদায় করতে ব্যবস্থাপত্রে ভুয়া বা মানহীন মেডিসিন লেখা, বড় অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে ভুয়া সার্টিফিকেট প্রদান করা, দালালের মাধ্যমে সরকারি হাসপাতালের রোগী পার্শ্ববর্তী ক্লিনিকে ভাগিয়ে নেয়া ইত্যাদি মন্দ কাজ থেকে তারা এখন দূরে থাকতে চান।
বিনিময়ে তারা একটু সম্মান চান, নিরাপত্তা চান, সরকারি কর্মঘণ্টার বাইরে প্রাইভেট প্র্যাকটিস করার জন্য একটা মোটামুটি মানের পরিবেশ চান। একজন প্রথম শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে রাষ্ট্রের কাছে এ চাহিদাগুলো কি খুব বেশি কিছু?
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নারীদের প্রতি দুর্বলতা সর্বজনবিদিত। বাংলাদেশে নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়নের শুরু তার হাত ধরেই। কিছুদিন আগে এক নারী সরকারি কর্মকর্তার ফেসবুক স্ট্যাটাস দেখে তিনি নিজে থেকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন।
গণমাধ্যম বরাবরই ডাক্তারদের নিজস্ব সমস্যাগুলো নিয়ে রিপোর্ট করতে চায় না। কয়েকদিন আগে পর্যন্ত স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিজেই জানতেন না যে, ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা করতে গিয়ে কয়েকজন চিকিৎসক এবং তাদের সন্তানরাও মৃত্যুবরণ করেছেন। তাই শুধু চিকিৎসক হওয়ার অপরাধে নারী চিকিৎসকদের চাপাকান্না প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে ব্যর্থ হয়।
৩৯তম বিসিএসে যোগদান করা ডাক্তারদের একটা বড় অংশ নারী। তাদের সবার পদায়ন হয়েছে ইউনিয়ন বা উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালে। আমরা তাদের কর্মস্থলের নিরাপত্তা নিয়ে খুব উদ্বিগ্ন। কারণ গত কয়েক বছর ধরে পুরুষ ডাক্তারদের সঙ্গে সঙ্গে নারী ডাক্তাররাও রোগীর স্বজন কিংবা এলাকার মাস্তানদের হাতে নিগৃহীত হয়ে আসছেন।
বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা পুলিশ, প্রশাসন, স্বাচিপ, বিএমএ, মিডিয়ার পক্ষ থেকে কোনো ধরনের সহযোগিতা পান না। উল্টো ভিকটিমকেই আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ না করতে বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগ করা হয়। দেশের অধিকাংশ উপজেলা হাসপাতাল নারীদের কাজ করার অনুপযুক্ত। থাকা-খাওয়ার অবস্থা শোচনীয়, বসার ভালো ব্যবস্থা নেই, টয়লেটগুলো ব্যবহারের অযোগ্য। নারী ডাক্তাররা এগুলো মেনেও নিয়েছেন। তারা শুধু নিরাপত্তাটুকু চান। চাকরি করতে গিয়ে তাদের যেন অন্তত শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হতে না হয়, ধর্ষিত হতে না হয়, প্রাণ দিতে না হয়।
আর এসব কারণেই সেদিন চিকিৎসকদের যোগদান অনুষ্ঠানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতি খুবই জরুরি ছিল। নতুন চিকিৎসকরা আর স্বাস্থ্য অধিদফতর, স্বাচিপ, বিএমএ নেতাদের গৎবাঁধা মিথ্যা প্রতিশ্রুতিতে ভরপুর বক্তৃতা শুনতে চায় না। যাকে আমি আমার বিপদের সময় পাশে পাই না, তার মুখ থেকে বের হওয়া নীতিকথাগুলো আমার কাছে আবর্জনাই মনে হবে। অন্যদিকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যদি নবীন চিকিৎসকদের উদ্দেশে পাঁচ মিনিটও বক্তৃতা দিতেন, সেটাই তাদের জন্য একটি বিশাল অনুপ্রেরণা হতো।
প্রধানমন্ত্রী বক্তব্য প্রদানের আগে মেধা তালিকায় স্থান পাওয়া ডাক্তারদের মধ্য থেকে অন্তত দু-একজনকে নিজেদের অনুভূতি প্রকাশ করার সুযোগ দেয়া প্রয়োজন ছিল। আমি নিশ্চিত কোনো বক্তা যদি কর্মস্থলে নিরাপত্তাহীনতা, বিশেষ করে, নারীদের নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর কানে পৌঁছাতে পারতেন, তাহলে নিশ্চিতভাবে প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতায়ও সেটির প্রতিফলন ঘটত। প্রধানমন্ত্রী যদি নারী চিকিৎসকদের ওপর হামলাকারীদের হুশিয়ারি দিতেন, সারা দেশে হাসপাতালসংশ্লিষ্ট সহিংসতা অনেকাংশে কমে যেত। প্রতিটি উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্সে স্থায়ী পুলিশ ফাঁড়ি বানিয়ে তাতে ২৪ ঘণ্টা একজন পুলিশ এবং কয়েকজন আনসারের উপস্থিতি নিশ্চিত করা কি খুব কঠিন কাজ?
পেশাজীবী সংগঠনগুলোর সৃষ্টি হয় পেশার স্বার্থরক্ষা করার জন্য। দুর্ভাগ্যজনকভাবে চিকিৎসকদের বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনগুলো ঠিক বিপরীত কাজটি করছে। যে স্বাচিপ-বিএমএর আজ ডাক্তারদের পক্ষ হয়ে উল্লিখিত সমস্যাগুলো নীতিনির্ধারকদের কাছে পৌঁছে দেয়ার কথা ছিল, তারাই আজ পৌঁছানোর পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন। তারা নিজেরাও কিছু করবেন না, অন্যদেরও করতে দেবেন না। নেতৃত্বের ইতিবাচক পরিবর্তন ছাড়া এ দেয়াল ভাঙা অসম্ভব।
ডা. জাহিদুর রহমান : সহযোগী অধ্যাপক (ভাইরোলজি), শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ; সাংগঠনিক সম্পাদক, ফাউন্ডেশন ফর ডক্টরস সেফটি অ্যান্ড রাইটস