বিশ দিন বয়সী জটিল জোড়া যমজ আবদুল্লাহ। নোয়াখালীর মাইজদিতে জন্ম নেয় এই নবজাতকটি। কিন্তু ভূমিষ্টের পরই দেখা গেল নবজাতকের সন্মুখভাগে আরেকটি দেহের অস্তিত্ব রয়েছে কিন্তু তা অসম্পূর্ণ। অর্থাৎ একটা দেহ আরেকটি দেহের সঙ্গে লেপ্টে রয়েছে। নবজাতকটির চার হাত পা সম্পূর্ণ সুগঠিত। অন্য অংশটির উদর, নিতম্ব, দুটো কিডনি, মুত্রপথ, পায়ুপথ সব ঠিকঠাক থাকলেও মস্তিষ্ক ও হৃদপিন্ড নেই।

মেডিক্যালের পরিভাষায় একে বলা হয় ‘প্যারাসাইটিক টুইন’। প্যারাসাইট অর্থ আগাছা। অন্য অংশটি আগাছার মতোই আবদুল্লাহর দেহের সঙ্গে বেড়ে উঠেছে। নবজাতকটির পিতা আনসারের কনেস্টবল। মাইজদিতে সার্বিক চিকিৎসা সম্ভব নয় বলে উন্নত চিকিৎসার জন্য দুই সপ্তাহ পূর্বে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের শিশু সার্জারি বিভাগে ভর্তি করা হয়। এখন নবজাতকটি শিশু সার্জারি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. আশরাফ উল হক কাজলের অধীনে বিশেষজ্ঞ মেডিক্যাল টিমের আওতায় চিকিৎসাধীন রয়েছে। আগামী রবিবার জটিল অপারেশন করে দেহ আলাদা করা হবে বলে জানা গেছে।

আজ বৃহস্পতিবার অধ্যাপক ডা. আশরাফ উল হক কাজল বলেন, মূল নবজাতক আবদুল্লাহ সম্পূর্ণ শরীর ধারণ করেছে। তার লিভার, কিডনি, হার্টসহ অন্যান্য অঙ্গ সঠিকভাবেই কাজ করছে। কিন্তু প্যারাসাইট বা অপর অংশটি জীবিত অবস্থায় ভূমিষ্ট হয়েছে সেটা আমরা বলতে পারছি না। কেননা তার মস্তিষ্ক ও হৃপিন্ড নেই। এগুলো ছাড়া কেউ বাঁচতে পারে না। আলাদা দেহটি আবদুল্লাহর দেহের পুষ্টিও পাচ্ছে না। তাকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে এটাকে অবশ্যই অপসারণ করাতে হবে।

তিনি আশাবাদী হয়ে বলেন, ‘ভর্তির পর ইউরোলজিস্ট, প্লাস্টিক সার্জন, শিশু সার্জনদের নিয়ে দুটো মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করে দুই সপ্তাহ বিভিন্ন পরীক্ষা নিরিক্ষা করে আমরা এটা নিশ্চিত হয়েছি যে, আবদুল্লাহর কানেক্টিভ প্লেস বা শরীরের জোড়া লাগানো অংশে গুরুত্বপূর্ণ এমন কিছু নেই যে, অপারেশনে আবদুল্লাহর জীবন হুমকীর সন্মুখীন হবে। সব কিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী রবিবার আবদুল্লাহর দেহ অপারেশন করে আলাদা করা হবে।’

অধ্যাপক ডা. আশরাফ উল হক কাজল আরো বলেন, এ ধরণের জোড়া যমজ অপারেশনে আমাদের অভিজ্ঞতা কিন্তু কম নয়। কিছুদিন আগেও ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে জটিল জোড়া শিশুর অপারেশন সাফল্যের সঙ্গেই সম্পন্ন করেছে আমাদের টিম। এবারের অপারেশনটিতেও যথেষ্ট ঝুঁকি রয়েছে। শিশু সার্জারি, অ্যানেশথিয়া ও কসমেটিক সার্জারির আট জনের চিকিৎসক দল নিয়ে একটি মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করা হয়েছে। আমরা আশাবাদী যে, এবারো সাফল্যের সঙ্গেই অপারেশন সম্পন্ন হবে।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম নাসির উদ্দিন বলেন, ‘নবজাতকটির পরিবারের তেমন আর্থিক সঙ্গতি না থাকায় সব পরীক্ষা নিরিক্ষা বিনামূল্যে করাসহ ওষুধপত্র অনেকাংশেই হাসপাতালের পক্ষে বহন করা হচ্ছে।’

কিন্তু কেন এই জটিল জোড়া যমজ?

উইকিপিডিয়াসহ ইন্টারনেট ঘেটে জানা গেছে, ফার্টিলাইজেশন বা ডিম্বাণু নিষিক্তের সময় লাখ লাখ শুক্রাণুর মধ্যে শুধুমাত্র একটি শুক্রাণু একটি ডিম্বাণুকে নিষিক্ত করে। ফলশ্রুতিতে কোনো মানব শিশুর জন্ম হয়। কিন্তু ডিম্বাণু নিষিক্তের পর শুক্রাণু কখনো দু’ভাগ হয়ে গেলে যমজ শিশুর জন্ম হয়। এটা কখনো তিন বা চার ভাগও হতে পারে। সেক্ষেত্রে তিনটি বা চারটি নবজাতকও দেখা যায়। আবদুল্লাহর ক্ষেত্রে যা ঘটেছে বলে মনে করা হচ্ছে তা হলো, এটা সম্পূর্ণ দু’ভাগ হয়নি এবং তা পরষ্পরের সঙ্গে সংযুক্ত ছিলো। বিশ্বব্যাপী এ ধরণের যমজদের শল্যচিকিৎসার মাধ্যমে আলাদা করা হলেও কনজয়েন্ট টুইন বা জোড়া যমজ শিশুর জন্মের ঘটনা কিন্তু বিরল! প্রতি ২.৫ মিলিয়ন নবনজাতকের মধ্যে একজনের ক্ষেত্রে এই ধরণের ঘটনা ঘটে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *