ফ্রেঞ্চ ফ্রাই এবং ফ্রায়েড চিকেন উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, বিষণ্ণতা, স্টোক ও ক্যান্সারের কারণ হতে পারে বলে উঠে এসেছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) এক গবেষণায়। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এসব খাবার তৈরিতে উচ্চমাত্রার সোডিয়াম, ট্রান্স ফ্যাট, ব্যবহার করা হয়ে থাকে।
সোমবার (১৪ মার্চ) শহীদ ডা. মিল্টন হলে পাবলিক হেলথ এন্ড ইনফরমেটিক্স বিভাগের উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ‘খাদ্যে ক্ষতিপূরক উপাদানের উপস্থিতি’ (ফুড হ্যাজার্ড) নিয়ে ৩টি গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হয়।
রাজধানীতে পাওয়া যায় এমন ‘ফ্রেঞ্চ ফ্রাই এবং ফ্রায়েড চিকেনে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকারক উপাদান’ এই গবেষণাটি করেন ডা. সাজিয়া ইসলাম।
এ গবেষণার ফলাফলে বলা হয়েছে, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই এবং ফ্রায়েড চিকেন নিম্ন খাদ্যমান ও স্থূলতার সাথে সম্পর্কযুক্ত। এইসব খাবারে উচ্চমাত্রার সোডিয়াম, ট্রান্স ফ্যাট, ভারী ধাতু (হেবি মেটাল) ব্যবহার করা হয়ে থাকে। যেগুলো উচ্চরক্তচাপ, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, বিষণ্ণতা, স্টোক ও ক্যান্সারের কারণ হতে পারে। বাংলাদেশের মানুষ, বিশেষ করে শিশু কিশোরদের পছন্দের খাদ্যতালিকায় ফাস্ট ফুড বড় আসন দখল করে আছে। ফলে তাদের মধ্যে স্থূলতার পরিমাণ বাড়ার পাশাপাশি পরবর্তীতে অসংক্রামক রোগ হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। ৫টি সর্বোচ্চ বিক্রিত (দৈনিক বিক্রির পরিমাণ অনুযায়ী) ফ্রেঞ্চ ফ্রাই এবং ফ্রায়েড চিকেনের নমুনার উপর এ গবেষণাটি করা হয়। এতে দেখা যায়, ফ্রেঞ্চ ফ্রাইয়ের ১০০ গ্রামের একটি পরিবেশনে সোডিয়াম-০.৪৫ গ্রাম, আর্সেনিক-০.০৯৩ মি. গ্রাম, ট্রান্স ফ্যাটি এসিড-০.১১ গ্রাম। সীসা-০.০০৩ মি.গ্রাম রয়েছে। অর্থাৎ এক পরিবেশন ফ্রেঞ্চ ফ্রাই খেলে দৈনিক অনুমোদিত মাত্রার চার ভাগের এক ভাগ পরিমাণ সোডিয়াম খাওয়া হয়ে যাবে। এক পরিবেশন ফ্রেঞ্চ ফ্রাই খেলে দৈনিক সর্বোচ্চ অনুমোদিত মাত্রার ৪২.২৭% পরিমাণ আর্সেনিক খাওয়া হয়ে যাবে।
ফ্রায়েড চিকেনের ১০০ গ্রামের একটি পরিবেশনে সোডিয়াম-০.৪৬ গ্রাম। এক পরিবেশন ফ্রেঞ্চ ফ্রাই খেলে দৈনিক অনুমোদিত মাত্রার চার ভাগের এক ভাগ পরিমাণ খাওয়া হয়ে যাবে। আর্সেনিক-০.০৫৩ মি. গ্রাম এবং সীসা ০.০০৬ মি. গ্রাম। এক পরিবেশন ফ্রায়েড চিকেন খেলে দৈনিক সর্বোচ্চ অনুমোদিত মাত্রার ৩% গ্রহণ করা হয়ে যাবে, যেখানে দৈনিক অনুমোদিত মাত্রা আর্সেনিকের জন্য ০.২২ মি. গ্রাম এবং সীসার জন্য ০.২৫ মি.গ্রাম। ট্রান্স ফ্যাটি এসিড-০.১৩ গ্রাম।
রাজধানীতে পাওয়া যায় এমন ‘ঠান্ডা পানীয় স্বাস্থের জন্য ক্ষতিকারক উপাদান’ এই গবেষণাটি করেন ডা. এএইচএম গোলাম কিবরিয়া।
এ গবেষণায় বাংলাদেশে মোট মৃত্যুর ৬৭ শতাংশের এর জন্য অসংক্রামক রোগকে দায়ী করা হয়েছে। চিনি, ক্যাফেইন, ভারী ধাতু ইত্যাদিযুক্ত কোমল পানীয় অসংক্রামক রোগের পাশাপাশি শিশুদের স্থূলতার পরিমাণ বৃদ্ধি করতে ভূমিকা পালন করে। ঢাকা শহরের বাজারে পাওয়া সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া পেট-বোতলজাত ব্র্যান্ডের দশটি কোমল পানীয় এবং পাঁচটি এনার্জি ড্রিংকের নমুনা সংগ্রর করে এ গবেষণাটি করা হয়। এতে দেখা যায়, প্রায় তিন-চতুর্থাংশ পানীয়ের পিএইচ মাত্রা ৩ এর নিচে ছিল। অ্যাসিডিক মাত্রা ৩ এর নিচে থাকা দাঁতের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর হতে পারে। একটি পরিবেশনে (২৫০ মিলি) মোট চিনির পরিমাণ কোমল পানীয়ের জন্য ২০.৮-২৮.৮ গ্রাম এবং এনার্জি ড্রিংকের জন্য ২২.৬-৩৭.০ গ্রাম পাওয়া গেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুযায়ী একজন প্রাপ্তবয়স্কের জন্য একদিনে সর্বোচ্চ চিনি গ্রহণ মাত্রা ২৫ গ্রাম। অধিকাংশ পানীয়ের বেলায়ই একটি পরিবেশন দৈনিক সর্বোচ্চ মাত্রা পূরণ করে ফেলতে পারে। কোমল পানীয়ের তুলনায় এনার্জি ড্রিংকে ক্যাফেইনের মাত্রা বেশি ছিল। ক্যাফেইনের জন্য বিএসটিআই অনুমোদিত সর্বোচ্চ গ্রহণযোগ্য মাত্রা ১৪৫ পিপিএম হলেও একটি এনার্জি ড্রিংকে এর মাত্রা পাওয়া গেছে ৩২১.৭ পিপিএম। এক পরিবেশন (২৫০ মিলি) কোমল পানীয় এবং এনার্জি ড্রিংকে সীসার মাত্রা ছিল যথাক্রমে ০.০৫৩ মি.গ্রাম এবং ০.০৪৮ মি.গ্রাম।
বাংলাদেশে সর্বাধিক প্রচলিত প্রক্রিয়াকৃত ‘প্যাকেটজাত খাবারে লবণ, চিনি এবং চর্বি এর পরিমাণ মূল্যায়ন করা এবং খাদ্যের লেবেলে প্রদত্ত তথ্যের সাথে সামঞ্জস্যতা যাচাই করা’ এই গবেষণাটি করেন প্রফেসর ড. সোহেল রেজা চৌধুরী।
এ গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, উচ্চ পরিমাণে লবণ, চিনি, এবং ক্যালরি থাকার কারণে এই খাবারগুলো স্থূলতা এবং খাদ্য-সম্পর্কিত অসংক্রামক রোগের প্রধান অবদানকারী হিসেবে পরিচিত। অন্যান্য দেশের মত বাংলাদেশেও প্রক্রিয়াজাত খাবারের উৎপাদন বার্ষিক গড়ে ৮% বৃদ্ধি পেয়েছে। দ্রুত নগরায়ণ, ক্রমবর্ধমান আয় এবং খাদ্য শিল্পের সম্প্রসারণকে প্রক্রিয়াকৃত খাবারের চাহিদা বৃদ্ধির চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। খাদ্য নির্বাচনের সময় সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে এবং ক্যালরি সমৃদ্ধ ও পুষ্টিহীন খাবারের ব্যবহার এড়ানোর ক্ষেত্রে ভোক্তারদের সহায়তা করার জন্য যথাযথ পুষ্টি লেবেলিং একান্ত প্রয়োজন। বাংলাদেশের সর্বাধিক প্রচলিত প্রক্রিয়াকৃত প্যাকেটজাত খাবারে কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, চর্বি, ক্যালরি, ডায়েটারি ফাইবার, সোডিয়াম, চিনি, এসএফএ এবং টিএফএ এর পরিমাণ মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। আটটি প্রশাসনিক বিভাগে পরিচালিত পারিবারিক জরিপ এবং বাজার সমীক্ষা এর মাধ্যমে মোট ৯টি সর্বাধিক প্রচলিত প্রক্রিয়াকৃত প্যাকেটজাত খাবার চিহ্নিত করা হয়েছিল। কোন ব্র্যান্ডের পণ্যই টিএলএল সিস্টেম অনুযায়ী ক্ষতিকর উপাদানগুলোতে সবুজ (কম পরিমাণে) এবং এইচএসআর স্কিম অনুযায়ী ৪ বা তার বেশি স্টার পায়নি। একমাত্র মটর ভাজা এইচএসআর সিস্টেমে সর্বোচ্চ গড়ে ২.৫ রেটিং পেয়েছিল। প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট, ক্যালরি, লবণ, চিনি, এসএফএ এবং টিএফএ এর সঠিক প্রতিবেদন কোনো পণ্যতেই পাওয়া যায়নি। ১০০ গ্রাম লজেন্স/ললিপপ, ভাজা ডাল/মটর এবং দুধের চকোলেট বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত মান অতিক্রম করেছিল। ৭০.৮ শতাংশ নমুনায় কার্বোহাইড্রেট পরিমাণ অতিরিক্ত এবং ৬৬.৭ শতাংশ নমুনায় লবণের পরিমাণ কম রিপোর্ট করা হয়েছিল। ৪৫.৮ শতাংশ নমুনায় এসএফএ, ৩৭.৫ শতাংশ নমুনায় টিএফএ ও ফাইবার এবং ২০.৮ শতাংশ নমুনায় লবণ ও চিনির রিপোর্ট অনুপস্থিত ছিল।
অনুষ্ঠানে বিএমআরসি এর সভাপতি অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ এর নেতৃত্বে গবেষণার ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। এ ধরণের গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে জানানোর জন্য অবশ্যই রেকর্ড রাখতে হবে।
তিনি আরো বলেন, লবণ ও চিনি পরিমিত খেতে হবে। মানুষের মধ্যে ভুল ধারণা আছে যে, শুধু কাঁচা লবণ না খেলেই চলে, আসলে তা নয়, রান্নাতেও লবণের ব্যবহার পরিমিত হতে হবে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ বলেন, আমরা কারো বিরুদ্ধে নই, আমাদের গবেষণার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষকে সচেতন ও সতর্ক করা। স্বাস্থ্যসম্মত খাবারের সাথে সাথে নিয়মিত ব্যয়াম ও ডিসিপ্লিন এর অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে বলেও জানান তিনি।
উপস্থিত অন্য বক্তারা বলেন, খাবারের নামে কী খাওয়া হচ্ছে তা নিয়ে ভাবার সময় এসেছে। খাদ্য সামগ্রী উৎপাদক ও ব্যবসায়ীদের জাতির প্রতি দায়িত্ব থাকতে হবে। প্রতারণা, ছাল-চাতুরী বন্ধ করতে হবে। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে এবং সম্মিলিত পর্যায়ে কাজ করতে হবে বলে জানান তারা।
গবেষণা ফলাফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য ও সমাজ কল্যাণ বিষয়ক সাবেক উপদেষ্টা ও বিএমআরসি এর বর্তমান সভাপতি অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ। সভাপতিত্ব করেন উপ-উপাচার্য (গবেষণা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. মো. জাহিদ হোসেন। অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ডা. একেএম মোশাররফ হোসেন, উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. ছয়েফ উদ্দিন আহমদ, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ আতিকুর রহমান, প্রক্টর অধ্যাপক ডা. মো. হাবিবুর রহমান দুলাল, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক খন্দকার আব্দুল আউয়াল রিজভী প্রমুখসহ অত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিনবৃন্দ, জনস্বাস্থ্যবিদ, সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকবৃন্দ। তত্ত্বাবধায়ক গবেষক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পাবলিক হেলথ এন্ড ইনফরমেটিক্স বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. খালেকুজ্জামান।
medivoice