আকাশপথে হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে গত ৩০ বছরে ১০ বার বাংলাদেশে সেবা দিয়ে গেছে উড়ন্ত চক্ষু হাসপাতাল অরবিস। সর্বশেষ ২০১৭ সালের নভেম্বরে অরবিস এসেছিল চট্টগ্রামে। আবার আগামী বছর কোনো একসময় আসবে বিশেষ করে অসহায়, দরিদ্র ও জটিল চক্ষুরোগীদের জন্য আশীর্বাদ এই হাসপাতাল। শুধু তাত্ক্ষণিক চক্ষু চিকিৎসাই নয়, উড়ন্ত এই হাসপাতাল বাংলাদেশের চক্ষুসেবার মানোন্নয়নে বহুমুখী কাজ করে যাচ্ছে দীর্ঘ সময় ধরে। অরবিস ফ্লাইং আই হসপিটাল নামের উড়ন্ত হাসপাতালটির পুরোটাই থাকে একটি বিমানের মধ্যে, যার ভেতরে থাকেন বিশ্বের বেশ কয়েকজন নামিদামি বিশেষজ্ঞ চক্ষু চিকিৎসক, নার্স ও সহযোগী কলাকুশলীরা। তাঁরা স্বল্প সময়ের জন্য বাংলাদেশে এসে চক্ষুসেবা দেওয়ার পাশাপাশি এখানকার চক্ষু চিকিৎসক ও নার্সদের উন্নত প্রযুক্তি ও চিকিৎসা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেন। এ সময় আগে থেকেই তালিকা করা বিশেষ জটিলতাসম্পন্ন রোগীদেরও চিকিৎসা করা হয় অরবিসে। এ সময় বিদেশিদের সঙ্গে দেশের খ্যাতিমান চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞরাও উপস্থিত থাকেন।

দেশের চক্ষুসেবার ব্যবস্থাপনাকে বর্তমান উন্নত অবস্থানে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে অরবিসের অবদান বেশ ইতিবাচক। বাংলাদেশে অরবিসের মহতী সেবা ও কর্মকাণ্ড সম্পর্কে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও শিশু চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এ এইচ এম এনায়েত হোসেন বলেন, ‘১৯৮৯ সালের দিকে একবার অরবিসের উড়ন্ত হাসপাতাল বাংলাদেশে এসে আমাদের মতো তরুণ এক দল চিকিৎসককে বিশ্বমানের চক্ষু চিকিৎসা সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেয়। সেই সঙ্গে অনেক ইন্টারকুলার লেন্স দিয়ে যায়, যা দিয়ে দেশে ওই সময় প্রথমবারের মতো সরকারিভাবে বড় আকারে ছানি অপারেশন করে লেন্স স্থাপনের কাজ শুরু হয়। এটা যেমন আমাদের দেশের জন্য বড় একটি মাইলফলক হয়ে আছে, তেমনি আরেকটি মাইলফলক হচ্ছে, বাংলাদেশে শিশুদের চক্ষু চিকিৎসাকে আজকের অবস্থানে নিয়ে আসা। এই অরবিসই প্রথম আলাদা করে চক্ষু চিকিৎসার বিষয়ে আমাদের বেশ কয়েকজনকে প্রশিক্ষিত করেছে।’

অরবিস ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের দেশীয় প্রতিনিধি ডা. মুনীর আহমেদ বলেন, বিশ্বব্যাপী পরিহারযোগ্য অন্ধত্ব প্রতিরোধ, চিকিৎসা ও সুরক্ষার জন্য দক্ষ জনবল তৈরি এবং জনগণের জীবনযাপন উন্নয়নের দায়িত্ব ও অঙ্গীকার নিয়ে ১৯৮২ সালে যুক্তরাষ্ট্রে আত্মপ্রকাশ করে সম্পূর্ণ অলাভজনক উন্নয়ন সংস্থা ‘অরবিস ইন্টারন্যাশনাল’। ব্যতিক্রমী উদ্যোগে চোখের চিকিৎসা দিতে ‘অরবিস’ উড়ন্ত চক্ষু হাসপাতালের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী দৃষ্টি সুরক্ষা কার্যক্রম শুরু করে। ‘উড়ন্ত চক্ষু হাসপাতাল’ একটি এমডি-১০ বিমানে স্থাপিত এবং যুক্তরাষ্ট্র অনুমোদিত বিশ্বের একমাত্র প্রশিক্ষণ ও চক্ষুবিষয়ক শিক্ষাসংক্রান্ত উড়ন্ত হাসপাতাল, যা উন্নত প্রশিক্ষণ এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তি হস্তান্তরের মাধ্যমে স্থানীয় চক্ষু চিকিৎসকসহ অন্যান্য সহযোগী কর্মীদের চক্ষুরোগ ও চিকিৎসাসংক্রান্ত জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ১৯৮২ সাল থেকে অরবিস বিশ্বব্যাপী ২৩ মিলিয়নের বেশি মানুষের চক্ষু চিকিৎসা দিয়েছে।

ডা. মুনীর আহমেদ জানান, বাংলাদেশে আনুমানিক সাড়ে সাত লাখ দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষ রয়েছে। এর মধ্যে সাড়ে ছয় লাখ ছানিজনিত কারণে অন্ধত্ব বরণ করেছে এবং প্রতিবছর এক লাখ ২০ হাজার মানুষ নতুন করে অন্ধত্ব বরণ করে। এর মধ্যে ৮০ শতাংশই গ্রামাঞ্চলে বসবাস করে। আর অরবিস ইন্টারন্যাশনাল শুরু থেকেই বাংলাদেশের মানুষের চক্ষুসেবায় কাজ করছে। এর মধ্যে শুরুতে কয়েক বছর অনিয়মিত বা স্বল্প মেয়াদি কিছু কাজ করলেও দীর্ঘ মেয়াদি কর্মসূচি শুরু করা হয় ২০০০ সাল থেকে। বাংলাদেশে সরকারি ও বেসরকারি ১৩টি সহযোগী চক্ষু হাসপাতাল, তিনটি উন্নয়ন সংস্থাসহ সাতটি ডায়াবেটিস হাসপাতালের মাধ্যমে অরবিস মোট ২৩টি সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে কাজ করে এ পর্যন্ত ২৭ হাজারের বেশি চক্ষু চিকিৎসকসহ নার্স, প্যারামেডিকস, মাঠ পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের বিভিন্ন পর্যায়ে প্রশিক্ষণ দিয়েছে। এ ছাড়া প্রায় ৬০ লাখ মানুষের চক্ষু পরীক্ষা ও ৪০ লাখ রোগীর চিকিৎসা সম্পন্ন করা হয়েছে। এ পর্যন্ত অরবিস পার্টনারদের সহায়তায় বিনা মূল্যে চোখে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে শিশুসহ দুই লাখের বেশি রোগীর দৃষ্টি ফিরিয়ে দিতে সাহায্য করেছে।

অরবিস বাংলাদেশে প্রথম শিশু অন্ধত্ব নিবারণের জন্য ১৩টি বিশেষায়িত শিশুবান্ধব চক্ষু চিকিৎসা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করে। বিশেষ করে যেসব শিশু দৃষ্টি স্বল্পতায় ভুগছে তাদের মাঠ পর্যায়ে আউটরিচ, স্কুল সাইট টেস্টিং প্রগ্রাম এবং ভিশন সেন্টারের মাধ্যমে শিশুবান্ধব চক্ষুসেবা কেন্দ্র থেকে সার্জারির মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ চক্ষুসেবা দেওয়া হয়ে থাকে। শহর অঞ্চলের পাশাপাশি প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের দোরগোড়ায় চক্ষুসেবা পৌঁছে দিতে অরবিস এ পর্যন্ত ২৭টি স্থায়ী ‘চক্ষু চিকিৎসা কেন্দ্র’ (ভিশন সেন্টার) প্রতিষ্ঠা করেছে। এ ছাড়া ২০১৮ সাল থেকে কক্সবাজারে রোহিঙ্গা আশ্রয়প্রার্থী ও স্থানীয় জনগণের চোখের চিকিৎসায় কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

কেবল চিকিৎসা বা প্রশিক্ষণই নয়, এর সঙ্গে চোখের উন্নত ও সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে অরবিস নিজস্ব প্রযুক্তি ও সফটওয়্যার উদ্ভাবন ও ব্যবহার প্রবর্তন করে। এর মধ্যে পেশেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম (পিআইএস), আউটবাউন্ড ডায়ালিং (ওবিডি) এবং আইকম সফটওয়্যার ফর ডিআর উল্লেখযোগ্য। অরবিস বাংলাদেশে শিশু ও ডায়াবেটিসজনিত অন্ধত্ব প্রতিরোধে ডায়াবেটিস হাসপাতালগুলোর সঙ্গেও কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এ ছাড়া সরকারের ৪০০টি কমিউনিটি ক্লিনিকের সঙ্গে চক্ষু চিকিৎসা সেবা কার্যক্রম শুরু করেছে।

স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বলেন, ‘অরবিস আগে কেবল বিমান নিয়ে এসে এখানে প্রশিক্ষণ ও সেবা দিয়ে চলে যেত। একপর্যায়ে আমাদের শিক্ষক ও শীর্ষ চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী দেশে অরবিসের একটি অফিস স্থাপনের মধ্য দিয়ে তাদের কাজের পরিধি বাড়িয়ে দেন।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *