আলী আসগর চৌধুরী : নাবিল সাহেবের ছোট সংসার, স্ত্রী আর দুই মেয়ে নিয়ে সুখী পরিবার। হঠাৎ একদিন তাঁর স্ত্রী শায়লার বাঁ স্তনে ছোট চাকা ধরা পড়ল। দেরিতে শনাক্ত হওয়ায় এই ক্যানসার শরীরে সর্বত্র ছড়িয়ে গেল। নানান চিকিৎসা হলেও আট মাসের মাথায় শায়লা এ পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে গেলেন। শোকাহত নাবিল সাহেব তাঁর অবুঝ দুই মেয়ের নানান প্রশ্নের উত্তরে নির্বাক। অন্যদিকে সব সম্বল খুইয়ে ধারদেনার হিসাব মেলাতে জীবন অতিষ্ঠপ্রায়।

এই রকম গল্প ক্যানসারে আক্রান্ত আমাদের দেশের অধিকাংশ পরিবারের। রোগ শনাক্তে বিলম্বের কারণে ও অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা চিকিৎসার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, এক-তৃতীয়াংশ ক্যানসার রোগীর চিকিৎসায় সারা জীবনের সঞ্চয় ব্যয় হয়ে যায়।

গ্লোবাল ক্যানসার অবজারভেটরির (জিসিও) হিসাব অনুযায়ী, ২০১৮ সালে সারা বিশ্বে নতুন করে ১ কোটি ৮০ লাখ ১০ হাজার মানুষ ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছে এবং ৯৬ লাখ মানুষ ক্যানসারের কারণে মৃত্যুবরণ করেছে। ক্যানসারজনিত মৃত্যুর অর্ধেকের বেশি হয়েছে এশিয়ায়। যেখানে আছে বিশ্ব জনসংখ্যার ৬০ শতাংশ মানুষ। অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় এই অঞ্চলে খাদ্যনালি, পাকস্থলী ও লিভার ক্যানসারের হার অনেক বেশি।

গ্লোবোকেনের তথ্যমতে, বাংলাদেশে ২০১৮ সালে নতুন করে দেড় লাখ মানুষ ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছে, ১ লাখ ৮ হাজার মানুষ ক্যানসারের কারণে মৃত্যুবরণ করেছে। খাদ্যনালি, মুখগহ্বর, স্তন, ফুসফুস ও জরায়ু ক্যানসারে আক্রান্তের হার সর্বাধিক। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৪০ সালের মধ্যে সারা বিশ্বে ২ কোটি ৯৫ লাখ নতুন ক্যানসার রোগীর সৃষ্টি হবে, যার ৩০-৫০ শতাংশ প্রতিরোধযোগ্য।

ক্যানসার চিকিৎসার ব্যয় বিশাল এবং বহুমাত্রিক। ২০১০ সালে পৃথিবীতে ক্যানসার চিকিৎসায় ১ দশমিক ১৬ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে, যা ছিল বিশ্ব জিডিপির ২ শতাংশ। অথচ ক্যানসার নিয়ন্ত্রণে বিনিয়োগ করলে এর ফলাফল হতো আশাতীত। গবেষকেরা বলছেন, শুধু প্রতিরোধ কার্যক্রমে জোর দিলে ২০১০ সালে ১০০-২০০ বিলিয়ন ডলার ক্যানসার চিকিৎসার ব্যয় সাশ্রয় করা যেত।

ক্যানসার ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত নীতিমালা, দক্ষ জনবল, ওষুধের সহজলভ্যতা, আধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং উদার বিনিয়োগ। ইউরোপিয়ান সোসাইটি অব মেডিকেল অনকোলজি ২০১৭ সালে এক রিপোর্টে উল্লেখ করে, ক্যানসারের ওষুধ সহজলভ্য না হলে তা কম কার্যকরী অথচ বেশি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াসম্পন্ন চিকিৎসার দিকে রোগীকে ধাবিত করবে। এতে সুপারিশ করা হয় যে প্রতিটি দেশে একটি জাতীয় চিকিৎসা কর্মকৌশল ও আর্থিক সহযোগিতার নীতিমালা থাকা উচিত, যা অতি প্রয়োজনীয় ওষুধগুলো নিরবচ্ছিন্ন ও সাশ্রয়ী মূল্যে পেতে সহযোগিতা করবে।

এশিয়ান জনগোষ্ঠীর প্রধান তিনটি প্রাণঘাতী মারাত্মক রোগ হলো ফুসফুস, স্তন ও কলোরেক্টাল ক্যানসার। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা যায়, ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ফুসফুসের ক্যানসারজনিত মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। আধুনিক চিকিৎসা ও টার্গেটেট চিকিৎসার
সমন্বয়ের মাধ্যমে আগের বছরের তুলনায় ২ দশমিক ৫ শতাংশ কমানো সম্ভব হয়েছে। গবেষণায় দেখা যায়, এশিয়ার জনগণের মধ্যে ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের একটি বড় অংশের (৪০-৪৫ শতাংশ) ইজিএফআর নামক একটি গ্রোথ ফ্যাক্টরের (জিএফ) পরিবর্তন ঘটে। এদের শুধু মুখে খাওয়ার ট্যাবলেট দিয়ে চিকিৎসার মাধ্যমে দীর্ঘ সময় রোগ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এই জন্য প্রয়োজন সাশ্রয়ী মূল্যে ইজিএফআর পরীক্ষা সহজলভ্য করা, ইজিএফআর টার্গেটেট মুখের খাওয়ার ওষুধের সহজপ্রাপ্যতা নিশ্চিত করা। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় হাতে গোনা ল্যাবরেটরিতে এই ধরনের পরীক্ষার ব্যবস্থা আছে, যার খরচ অনেক বেশি। এবং মুখে খাওয়া ওষুধের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না মূলত এর উচ্চমূল্য ও কঠিন বিপণনব্যবস্থার কারণে।

এই অঞ্চলে স্তন, ফুসফুস ও কলোরেক্টাল রোগীদের নির্ধারিত মূল্যে ক্যানসার ওষুধ কিনতে হয়। পক্ষান্তরে, উন্নত দেশগুলোতে এসব ওষুধ অনেক ক্ষেত্রে সাশ্রয়ী ও বিনা মূল্যে সরবরাহ করা হয়। ক্যানসারের ওষুধ দীর্ঘদিন ধরে খেতে হয়, অন্যদিকে ওষুধগুলোর উচ্চমূল্যের কারণে আমাদের মতো দেশের গরিব রোগীদের পক্ষে অনেক সময় কেনা সম্ভব হয় না। অথচ এসব নিশ্চিত করা গেলে রোগ নিয়ন্ত্রণের হার ১ দশমিক ৭ থেকে ৮ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেতে পারে।

২০১৭ সালে এক হিসাবে দেখা যায়, সারা বিশ্বের ৮০ কোটি মানুষ তাদের চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করতে গিয়ে তাদের আর্থিক সামর্থ্যের ১০ শতাংশের বেশি খরচ করেছে। ১৮ কোটি মানুষ তাদের আয়ের তুলনায় ২৫ শতাংশের বেশি খরচ করেছে। বলা হচ্ছে, ১০ কোটি মানুষ স্বাস্থ্য খাতে অর্থ জোগাতে গিয়ে দারিদ্র্যসীমার নিচে যেতে বাধ্য হয়েছে।

বাংলাদেশ সরকার বসে নেই। ইতিমধ্যে আটটি বিভাগীয় শহরে আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসংবলিত ১০০ বেডের ক্যানসার হাসপাতাল তৈরির অনুমোদন মিলেছে। নতুন নতুন রেডিওথেরাপি মেশিন চালু হয়েছে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে, অনেক রোগী বিনা মূল্যে ওষুধ পাচ্ছে, একটি সমন্বিত জাতীয় ক্যানসার রেজিস্ট্রেশন তৈরির কার্যক্রমও এগিয়ে চলেছে, কিন্তু ক্যানসার চিকিৎসার বিশাল ব্যয় সরকারের একার পক্ষে সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। তাই এ ব্যাপারে একটি সামাজিক দায়বদ্ধতা তৈরি প্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে। ক্যানসার প্রতিরোধে সচেতনতামূলক কর্মসূচি জোরদার করা এখন সময়ের দাবি। ২০২০ সালে দুই শতাধিক ক্যানসারের নতুন ওষুধ বিশ্ববাজারে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, অন্যদিকে আমরা এখনো প্রচলিত ওষুধগুলো সহজলভ্য করার অসম যুদ্ধে হিমশিম খাচ্ছি।

ক্যানসারের ওষুধ সহজলভ্য করার জন্য কিছু প্রস্তাব ভেবে দেখা যেতে পারে:

ক. ক্যানসারের ওষুধের রেজিস্ট্রেশন ও অনুমোদন সময় কমিয়ে আনা যেতে পারে। খ. উচ্চমূল্যের ওষুধগুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আর্থিক অনুদান দেওয়া যেতে পারে। গ. নির্দিষ্ট কিছু ওষুধকে স্বল্পমূল্যে সরবরাহের ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। ঘ. সরকার ওষুধ কোম্পানির সঙ্গে আলোচনা করে সাশ্রয়ী মূল্যে ওষুধ দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে। ঙ. মানসম্মত জেনেরিক ও বায়োসিমিলার ওষুধগুলোর সরবরাহ বাড়ানো যেতে পারে। চ. ওষুধ কোম্পানিগুলো রোগী সহায়তামূলক কর্মসূচি নিতে পারে। ছ. এনজিও বা স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ক্যানসার রোগীদের সহায়তার কর্মসূচি নিতে পারে।

জনসংখ্যাভিত্তিক ক্যানসার নিবন্ধন প্রণয়ন, ক্যানসার চিকিৎসার ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, দক্ষ জনবল সৃষ্টি, মৌলিক গবেষণা পরিচালনা এবং যথাযথ চিকিৎসাপদ্ধতি বাস্তবায়নের সক্ষমতা অর্জন—এই নীতিমালার আলোকে আমাদের দেশের ক্যানসার চিকিৎসা এগিয়ে নিতে হবে।

ডা. আলী আসগর চৌধুরী: ক্লিনিক্যাল অনকোলজিস্ট
asgar85@yahoo.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *