ডা. মোস্তাফিজুর রহমান : চীনের সঙ্গে সারা বিশ্বের যোগাযোগব্যবস্থা খুব ভালো। বিভিন্ন দেশ থেকে মানুষজন সেখানে যায় এবং নিজ দেশে ফিরে আসে। তাই এই ভাইরাস অন্যান্য দেশেও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে এবং এরই মধ্যে ব্রিটেন, ইউরোপ, আমেরিকা, জাপান, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন, এমনকি আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও এই ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত রোগীর সন্ধান মিলেছে। আশার কথা যে আক্রান্ত হওয়ার সংখ্যাটা খুবই কম। এরই মধ্যে ফিলিপাইনে একজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেলেও চীন ছাড়া অন্য কোনো দেশে এখন পর্যন্ত মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এরই মধ্যে করোনাকে ‘গ্লোবাল ইমার্জেন্সি’ ঘোষণা করেছে। ভয় বা আতঙ্কের জন্য নয়; বরং এ ধরনের ঘোষণা দেওয়ার অর্থ হলো, কোনো দেশের সরকার যেন অলসভাবে বসে না থাকে। তাই বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পোর্ট (এয়ারপোর্ট, সি-পোর্ট, ল্যান্ডপোর্ট) এখন বিশেষ ব্যবস্থা নিচ্ছে। বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের উদ্যোগেও নানা পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। আশার কথা হলো, ইবোলা সার্স মহামারির সময় সরকার যেসব ব্যবস্থা নিয়েছিল, এবারও তেমন নেওয়া হয়েছে বাংলাদেশেও।

সর্বশেষ মহামারি
গুটিবসন্ত, কলেরা বা প্লেগের মতো রোগে আক্রান্ত হয়ে একসময় অনেক মানুষ মারা যেত। দেশের সীমানা ছাড়িয়ে যখন কোনো রোগ বিভিন্ন দেশে বা এক উপমহাদেশ থেকে আরেক উপমহাদেশে হঠাৎ করে ছড়িয়ে পড়ে এবং অসংখ্য মৃত্যু ঘটায়, তখন তাকে প্যান্ডেমিক বলে। ১৩০০ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ইউরোপ ও এশিয়ায় ‘কালো মৃত্যু’ বা Black Death নামের প্লেগজনিত এক মহামারি রোগ ছড়িয়ে পড়ে। বিশ্বব্যাপী প্রাণ হারায় প্রায় ২০ কোটি মানুষ। ভারতীয় উপমহাদেশেও একসময় কলেরায় আক্রান্ত হয়ে অসংখ্য গ্রাম উজাড় হয়েছে। ২০১৩ সালে হঠাৎ করে বিভিন্ন দেশে ইবোলা ভাইরাসের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। কঙ্গো থেকে ছড়িয়ে পড়া এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় ১১ হাজার মানুষ। কিছুদিন আগে দক্ষিণ আমেরিকায় জিকা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছিল। একবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে এ রকম আরো কিছু মহামারির শঙ্কায় শঙ্কিত ছিল মানুষ। যেমন—সোয়াইন ফ্লু, সার্স, মার্স ইত্যাদি।

আশাজাগানিয়া কিছু ঘটবে
অতীতে পৃথিবীতে যখনই কোনো মহামারির আবির্ভাব হয়েছে, অসহায় আত্মসমর্পণ করা ছাড়া মানুষের হাতে তেমন কিছুই করার ছিল না। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসাবিজ্ঞানে এসেছে উৎকর্ষ। দুর্ঘটনা ঘটার আগেই প্রস্তুত হচ্ছে প্রতিষেধক। প্রতিষেধক না থাকলেও চিকিৎসক ও বিজ্ঞানীরা বাতলে দিচ্ছেন প্রতিরোধের উপায়। নতুন এই ভাইরাসের প্রতিষেধক এখন পর্যন্ত কোনো দেশ তৈরি করতে না পারলেও উন্নত বিশ্ব বা অনুন্নত বিশ্ব—সবাই এখন নজর দিচ্ছে এই ভাইরাস প্রতিরোধের দিকে। করোনাভাইরাসের প্রতিষেধক তৈরিতে বেশ কয়েকটি সংস্থা কাজ করছে। প্রতিষেধক তৈরির উদ্দেশ্যে কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘মলিকিউলার ক্ল্যাম্প’ কাজ করছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের অ্যালার্জি ও সংক্রামক রোগবিষয়ক জাতীয় সংস্থার সঙ্গে ম্যাসাচুসেটসের মডার্না ইনকরপোরেশন যুক্ত হয়ে প্রতিষেধক তৈরির উদ্দেশ্যে গবেষণা করছে। আর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সমন্বয় করছে নতুন এই প্রতিষেধক তৈরির পদক্ষেপে। আশা করা যায়, করোনার বেলায়ও হয়তো আশাজাগানিয়া কিছু ঘটবে।

কর্মক্ষমতা হারায়
বেশির ভাগ ভাইরাস মানব দেহে প্রবেশের পর কর্মক্ষমতা আস্তে আস্তে হারিয়ে দুর্বল হয়ে যায়। নতুন প্রজাতির করোনাভাইরাসের বেলায়ও এমনই ঘটবে বলে আশা করা যায়। শুধু মাঝের এই সময়ে একটু সতর্ক ও সচেতন থাকতে হবে। তাই ভ্রান্ত ধারণা না পুশে বা গুজব ও ভয় না ছড়িয়ে প্রতিরোধের উপায় নিয়ে আলোচনা করতে হবে, নিতে হবে সতর্ক পদক্ষেপ। নিজে আতঙ্কিত না হয়ে বা অন্যকে আতঙ্কিত না করে সচেতন হবে এবং সচেতনতা ছড়িয়ে দিতে হবে।

লেখক : লেকচারার, ইব্রাহিম মেডিক্যাল কলেজ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *