ডা. মোয়াজ্জেম হোসেন : টেলিমেডিসিন বলতে আমরা বর্তমানে প্রচলিত টেলিফোনের মাধ্যমে ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে পরামর্শ গ্রহণ (টেলিকনসালটেশন) এবং চিকিৎসা নেওয়াকে বুঝে থাকি।

প্রকৃতপক্ষে টেলিমেডিসিন হলো একটি অত্যাধুনিক চিকিৎসামাধ্যম, যা উন্নত দেশগুলোতে বহুল প্রচলিত। ইতোমধ্যে অনুন্নত দেশের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য বিনামূল্যে বিশেষায়িত চিকিৎসা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে রোবোটিক টেলিমেডিসিন পদ্ধতি ব্যাপক অবদান রেখেছে।

এক্ষেত্রে সব রোগ নির্ণয়ের বিভিন্ন যন্ত্রপাতির সঙ্গে সংযোগ করে তাৎক্ষণিক রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা প্রদান করা হয়; যেমন-ইসিজি, আল্ট্রাসনোগ্রাম, ইকো, সিটিস্ক্যান, এমআরআই ইত্যাদি।

যন্ত্রমানব বা রোবটই একমাত্র টেলিমেডিসিন মাধ্যম, যার সাহায্যে একজন চিকিৎসক পৃথিবীর অন্য প্রান্ত থেকে সুষ্ঠু চিকিৎসা দিতে পারেন। এক্ষেত্রে রোগীকে শারীরিক পরীক্ষা থেকে শুরু করে যান্ত্রিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা, মনোসমীক্ষণ এবং অন্যান্য পদ্ধতি ব্যবহার করে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা দেওয়া যায়।

বিশ্ব টেলিহেলথ ইনিশিয়েটিভ যে রোবটিক সিস্টেম তৈরি করেছে, সেখানে চিকিৎসার সব তথ্য সংরক্ষণ এবং তথ্য আদান-প্রদানের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। এছাড়া যেসব পরীক্ষা-নিরীক্ষা জরুরি, সেগুলো অতি সহজে টেলিমেডিসিন রোবটের সহায়তায় সম্পন্ন করা সম্ভব, যা কোনোভাবেই টেলিকনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে সম্ভব নয়। বিশ্বের অত্যাধুনিক স্বাস্থ্যপ্রযুক্তিতে যোগ হয়েছে রোবটিক টেলিমেডিসিন প্ল্যাটফর্ম এবং অনেক দেশেরই হাসপাতালগুলো এ প্রযুক্তি গ্রহণ করছে।

এ রোবট বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন স্থানে ডাক্তারদের সংযুক্ত করে একটি আলোচনার মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা ডিজাইন করতে পারে। এ প্রযুক্তিতে এআই (Artificial Intelligent)কে পাওয়ার হিসাবে ব্যবহার করা হয়। তাছাড়া ডাক্তার ও নার্সদের উচ্চতর চিকিৎসার প্রশিক্ষণ, মেডিকেল বোর্ড ও চিকিৎসকদের মধ্যে মতবিনিময় ইত্যাদি সহজভাবে করা যায়।

বর্তমানে বিশ্বে মাত্র ছয়টি হাসপাতালে এ রোবটিক চিকিৎসা পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। দেশে এই প্রথম আইএসিআইবির অন্তর্ভুক্ত ঢাকা জেলার সাভারে অবস্থিত ফাইলেরিয়া ও থেলাসেমিয়া হাসপাতালে রোবটিক টেলিমেডিসিন প্রযুক্তি ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইংল্যান্ডের চিকিৎসকের মাধ্যমে বিনামূল্যে সেবা প্রদান করা হচ্ছে, যা দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসাবে বিবেচিত হবে। এর ফলে রোগীদের আর বিদেশ গিয়ে চিকিৎসা করাতে হবে না। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে।

রোবটিক টেলিমেডিসিনের সুবিধাগুলো হলো : এ যন্ত্রমানব দ্বারা চিকিৎসা নিখুঁতভাবে করা সম্ভব। সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য সুলভ। দুর্লভ রোগের রোগ বিশ্লেষণ কম খরচে সুদক্ষ চিকিৎসকের মাধ্যমে করা যাবে। বিদেশি বিশেষজ্ঞ ডাক্তার ও রোগী সামনাসামনি আলোচনার মাধ্যমে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা করতে পারবেন। একজন বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের সহজেই একজন বিদেশি বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ ও মতবিনিময় করার সুযোগ রয়েছে। রোগ নির্ণয়বিষয়ক পরীক্ষা-নিরীক্ষা-এক্স-রে, মেমোগ্রাম, এমআরআই, আল্ট্রাসনোগ্রাম, ইসিজি, প্যাথলজি, সিটি স্ক্যান, ইকো কার্ডিওগ্রাম করা যাবে। সরাসরি অপারেশন থিয়েটারে বিদেশি সার্জনের পরামর্শ গ্রহণ করা যাবে। মানসিক রোগীদের থেরাপি দেওয়া সহজ হবে। চিকিৎসা প্রক্রিয়ায় রোগীদের সম্পৃক্ততা বাড়বে। রোগীর পরিচর্যার ক্ষেত্রে গুণগত মান বাড়বে। দ্রুত চিকিৎসাসেবা পাওয়া যাবে। চিকিৎসার জন্য বিদেশ ভ্রমণ কমিয়ে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার অপচয় কমানো যাবে। বিদেশি চিকিৎসকের পরামর্শে রোগী মানসিকভাবে আশ্বস্ত হবে। টেলিমেডিসিন রোবটের মাধ্যমে মৌলিক ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা যেমন-হার্ট, বক্ষব্যাধি, চর্ম ও যৌন রোগ ইত্যাদি সরাসরি নিরূপণ করার সুযোগ রয়েছে। রোবটের মাধ্যমে সহজেই রোগ বিশ্লেষণসহ রোগীর সব তথ্য সংরক্ষণ করা যাবে ইত্যাদি।

টেলিমেডিসিনের শীর্ষ বিশেষায়িত সেবা : টেলিরেডিওলজি, টেলি সাইকিয়াট্রিক, টেলিডার্মাটোলজি, টেলিঅফথালমোলজি, টেলিনেফ্রলজি, টেলিঅনকোলজি, টেলিপ্যাথলজি, টেলিরিহেবিলিটেশন, টেলিঅবস্ট্রেটিক ইত্যাদি।

টেলিমেডিসিন সেবার ক্ষেত্রগুলো হলো : রোবটের মাধ্যমে প্রত্যক্ষভাবে বিদেশি বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের দ্বারা বিনামূল্যে বিভিন্ন রোগের চিকিৎসা/পরামর্শ গ্রহণ করা যাবে; যেমন-চর্ম ও যৌন রোগ, ডায়াবেটিস, স্নায়ুতন্ত্রের রোগ, ক্যানসার, চক্ষুরোগ, হৃদরোগ, বক্ষব্যাধি, মেডিসিন, মানসিক রোগ, স্ত্রী রোগ, কিডনি রোগ, সংক্রামক রোগ, শিশু রোগ ইত্যাদি।

প্রফেসর ডা. মোয়াজ্জেম হোসেন : পরিচালক, সাভার ফাইলেরিয়া অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতাল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *