প্রতিদিন লিভার রোগীদের চিকিৎসা করতে গিয়ে যে জিনিসটা মনে হয়, তা হলো এ ধরনের রোগীরা তাদের খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে খুবই বিভ্রান্তিতে থাকেন। বিশেষ করে লিভার বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তাদের বিভ্রান্তি অনেক ক্ষেত্রেই বেড়ে যায়। কারণ, লিভার রোগীর পথ্যের ব্যাপারে আমাদের যে প্রচলিত বিশ্বাস তা অনেক ক্ষেত্রেই আধুনিক বিজ্ঞানের সঙ্গে খাপ খায় না।

কী খাবেন, কী খাবেন না

সিরোসিস হচ্ছে এমন একটি রোগ যেখানে লিভারের স্বাভাবিক গঠন এবং একটা পর্যায়ে কার্যক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। লিভার সিরোসিসের অনেক সমস্যার অন্যতম হচ্ছে অ্যাসাইটিস বা পেটে পানি আসা। তাই এক্ষেত্রে তরল এবং লবণ মেপে খাওয়াটা জরুরি। তরকারিতে যতটুকু লবণ দেওয়া হয়, তার বেশি লবণ এ ধরনের রোগীদের খাওয়া উচিত নয়। অনেকের ধারণা লবণ ভেজে খেলে সমস্যা নেই। এই ধারণাটা মোটেও ঠিক নয়, কারণ সমস্যাটা আসলে লবণে নয়, বরং সোডিয়ামে। এই সোডিয়াম আমরা মূলত দুভাবে খেয়ে থাকি। একটি হলো সোডিয়াম ক্লোরাইড বা খাওয়ার লবণ, অন্যটি সোডিয়াম বাইকার্বোনেট বা বেকিং পাউডার। এজন্যই অ্যাসাইটিসের রোগীদের বেকারি আইটেম যেমন বিস্কুট, কেক ইত্যাদি এবং কোমল পানীয় যেমন কোক, পেপসি ইত্যাদি এড়িয়ে চলা উচিত। অ্যাসাইটিসের রোগীরা যদি বেশি বেশি তরল পান করেন বা সোডিয়ামযুক্ত খাবার খান, তাহলে তাদের পেটের পানি বাড়বে বৈ কমবে না।

লিভার সিরোসিসের আরেকটি মারাত্মক জটিলতা হলো হেপাটিক অ্যানসেফালোপ্যাথি বা হেপাটিক কোমা। সহজ কথায় বলতে গেলে অজ্ঞান হয়ে যাওয়া। প্রাণিজ আমিষ যেমন মাছ, মাংস, ডিম, দুধ ইত্যাদি খুব বেশি পরিমাণে খেলে রক্তে অ্যামোনিয়ার পরিমাণ বেড়ে গিয়ে রোগীর অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই ডিকস্পেনসেটেড বা অ্যাডভান্সড লিভার সিরোসিসের রোগীদের এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। তবে প্লান্ট প্রোটিন যেমন ডাল এ ধরনের রোগীদের জন্য নিরাপদ। তাই বলে অতিরিক্ত সতর্ক হতে গিয়ে প্রাণিজ আমিষ একেবারেই বাদ দিলে চলবে না। সেক্ষেত্রে রক্তে ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা বেড়ে কিডনি ফেউলিওর হতে পারে। বিশেষ করে যেহেতু এ ধরনের রোগীদের কিডনি এমনিতেই নাজুক অবস্থায় থাকে এবং তারা হেপাটোরেনাল সিনড্রোম নামক মারাত্মক ধরনের কিডনি ফেউলিওয়ের ঝুঁকিতে থাকেন।

পাশাপাশি লিভার সিরোসিসের রোগীদের বাইরের খাবার এবং ফুটানো পানি খাবার ব্যাপারে খুবই সতর্ক থাকতে হবে। কারণ তাদের লিভারে যদি হেপাটাইটিস এ বা ই ভাইরাসের মতো পানি ও খাদ্যবাহিত ভাইরাসের সংক্রমণ হয় তবে তাদের খুব সহজেই একিউট অন ক্রনিক লিভারের মতো মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

লিভার সিরোসিস এবং আরও সহজভাবে বলতে গেলে লিভারে যে কোনো রোগীরই অ্যালকোহল থেকে দূরে থাকাটা অত্যন্ত জরুরি। অ্যালকোহল নিজেই অ্যালকোহলিক লিভার সিরোসিস করতে পারে। পাশাপাশি যারা অ্যালকোহল গ্রহণ করেন তাদের লিভার অ্যাবাসেস হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি। গবেষণায় এও দেখা গেছে যে, অ্যালকোহল গ্রহণ করলে হেপাটাইটিস সি ভাইরাসজনিত লিভার মাত্রা অনেক বৃদ্ধি পায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *