ডা: জাহাঙ্গীর কবির : লোক চক্ষুর অন্তরালে মানব দেহের অভ্যন্তরে বিভিন্ন কার্যকলাপ পরিচালিত হচ্ছে যা আমরা খালি চোখে দেখতে পাইনা। কিন্তু বিজ্ঞানের অভাবনীয় সাফল্যের বৌদলতে দেহের অনেক কিছুর রহস্যের জাল আজ উন্মুক্ত হতে শুরু করেছে। বেঁচে থাকার তাগিদে আমরা প্রতিনিয়ত বিভিন্ন ধরনের খাবার খাই। কিছু শরীরের জন্য ভালো কিছু খাবার শরীরের জন্য ক্ষতিকর।
শর্করা বা কার্ব আমিষ বা প্রোটিন, এবং ফ্যাট বা চর্বি আমাদের খাদ্য তালিকায় নৈমিত্তিক ম্যাক্রো । খাওয়ার পরে শর্করা রক্তে আসে চিনি হিসেবে, প্রোটিন এ্যামাইনো এসিড হিসাবে, আর ফ্যাট আসে ফ্যাটি এসিড হিসাবে। চিনিটা রক্তে আসে পাকস্হলী থেকে শর্করা খাবার পরে আর ইনসুলিন এর মাধ্যমে রক্ত থেকে চিনি কোষের ভেতর চলে যায়; আর আপনি যদি কঠিন ব্যায়াম করেন বা বেশি পরিশ্রমের কাজ করেন তবে চিনিটা সরাসরি কোষের ভেতর প্রবেশ করে, ইনসুলিন এর মাধ্যম ছাড়াই গ্লুট ফোর পাথওয়ে দিয়ে । মানে হাঁটা একটি ফ্রী চিকিৎসা ডায়াবেটিস রোগীর জন্য।
প্রোটিন আমাদের শরীরে মাংস পেশি গঠনে সাহায্য করে। আর ফ্যাট ছাড়া আমাদের চলেই না। আমাদের মস্তিষ্ক ফ্যাটের তৈরি, আমাদের গুরুত্বপূর্ন হরমোন গুলো ফ্যাটের তৈরি যেমন টেস্টোসটেরন, আমাদের নার্ভের কাভারিং গুলো ফ্যাটের তৈরি। যারা বলছেন ফ্যাট খাবেন না, তারা আসলে বোকার স্বর্গে বসবাস করছেন। আর যারা বাজে তেল প্রতিনিয়ত খাচ্ছেন তারা নিজের অজান্তে নিজের কত বড় সর্বনাশ করছেন তা যদি জানতেন তবে কেউ মেরে ফেলার হুমকি দিয়েও বাজে তেল আপনাদের খাওয়াতে পারতো না ।
আমরা যখন চিনি জাতীয় বা শর্করা জাতীয় খাবার খাচ্ছি সেটা তখন আমাদের শরীরে ATP বা শক্তি উৎপন্ন করছে। প্রয়োজনীয় শক্তি উৎপন্ন করার পর বাকিটুকু লিভার এবং মাসলে গ্লাইকোজেন হিসাবে শরীরে জমা করছে। আর এরপরও যেটা অতিরিক্ত থাকছে সেটা চর্বি হিসাবে শরীরে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ন স্হানে জমা থাকছে এবং দীর্ঘমেয়াদী অনেক রোগর কারন হল এই জমে থাকা অতিরিক্ত চর্বি। অর্থাৎ আপনি যখন ভাত, রুটি, আলু ,গম বা চিনি জাতীয় কিছু খেলেন এবং পরিমানে বেশী খেলেন তখন কিন্তু সেগুলো চর্বি হিসেবেই জমা হলো । খেলেন ভাত রুটি হলো চর্বি । আর আপনি যদি প্রোটিন বেশি পরিমাণে খান, তবে অতিরিক্তটুকুও কিন্তু চিনি হিসেবে শরীরে কনভার্ট হচ্ছে এবং পরে চর্বি হিসাবেই জমা হচ্ছে । ফ্যাটের ব্যাপারটাও প্রায় একই , এটা বেশি পরিমানে খেলে, যতটুকু শরীরের প্রয়োজন ব্যাবহার করবে বাকিটুকু সরাসরি চর্বি হিসাবে শরীরে জমা পড়ে থাকছে । এখন একটু হিসিব করে দেখুন আপনি অতিরিক্ত যাই খাচ্ছেন সবই কিন্তু শরীরে চর্বি, বা ফ্যাট হিসাবে জমা হচ্ছে ।
এবার বলছি শরীরে ফ্যাট এ্যাডপটেশন (বা চর্বি গলিয়ে চলা )কিভাবে শুরু হয় এবং কিভাবে আপনার অনাকাঙ্ক্ষিত চর্বিগুলো গলাবেন ।
প্রথমে আপনাকে কী করতে হবে, শর্করা জাতীয় খাবার একেবারেই কমিয়ে ফেলতে হবে, কমছে কম ৫% থেকে ১০% এ নামিয়ে ফেলতে হবে। এর জন্য শাক সবজি ছাড়া কিছুই খেতে পারবেন না। কারণ এই ৫-১০% শর্করা আপনার শাক সবজি থেকেই আসবে অন্য কিছু থেকে নয়। এমন কি মিষ্টি ফল, আইসক্রিম, চুইংগাম, ভাত, রুটি, নুডুলস কিছুই খেতে পারবেন না আপাতত । আর প্রোটিনের পরিমাণটা থাকতে হবে অল্প, মানে ২০% আর বাকিটা স্বাস্থ্যকর ফ্যাট খেতে হবে।
আপনাকে এখন জানতে হবে স্বাস্থ্যকর ফ্যাট কোন গুলো। ডিমের কুসুম, নারিকেলের তেল, MCT oil, এক্সট্রা ভার্জিন ওলিভয়েল, ওরগানিক কোকোনাট ওয়েল, মাছের তেল, মাছের ডিম, যে কোন প্রকার বাদাম, পিনাট বাটার (ঘরে তৈরী) আর মন্দের ভালো ঘানিতে ভাংগানো সরিষার তেল।
ফ্যাট এ্যাডপটেশন প্রক্রিয়াটি চালু করতে হলে, আপনাকে দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকতে হবে এবং ব্যায়াম করতে হবে, এতে আপনার শরীর কী করবে ? শরীরে জমে থাকে চিনি ব্যাবহার করবে চিনি শেষ হয়ে গেলে শরীর বিশেষ প্রক্রিয়ায় গ্লাইকোজেন কে বার্ন করতে শুরু করবে। যখনই শরীরে জমে থাকা চিনি এবং গ্লাইকোজেন শেষ হয়ে যাবে তখন শুরু হবে আসল খেলা। বেচারা শরীর, তার চাহিদা পূরণের জন্য আপনার শরীরে জমে থাকা চর্বি গলাতে শুরু করবে কারণ প্রথমেই বলেছি চর্বি হলো শক্তির আধার । আপনার অতিরিক্ত খাবারের শক্তি সেখানেই কিন্তু জমা হয়ে আছে। না খেয়ে থাকার আরেকটা উপকার হলো, আপনার শরীরে অটোফেজি শুরু হবে। অটোফেজি কী সেটা আগের পোস্টে উল্লেখ করেছি।
তবে ডায়েট শুরুর প্রথমেই না খেয়ে থাকা শুরু করবেন না। আপনার শরীরকে প্রস্তুত করুন। আপনার শরীরকে জানান দিন, বেটা এত দিন তো অখাদ্য, কুখাদ্য খেয়ে ভুঁড়ি আর শরীর বাড়িয়ে ফেলেছিস। এবার তোর সাইজ হবার পালা। তো সাত আট দিন শর্করা ৫-১০%, প্রোটিন ২০%, এবং উল্লেখিত ভালো ফ্যাট অধিক পরিমাণে খান, হাঁটুন এবং ব্যায়াম করতে থাকুন। এই কয়দিনে চিনি এবং গ্লাইকোজেনের স্টক ফুরিয়ে যাবে এবং ফ্যাট এ্যাডপটেশনের প্রক্রিয়াটা শুরু হয়ে যাবে। আর যখন আপনি ফাস্টিং শুরু করবেন বা দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকবেন তখন আপনার শরীরে চর্বি দ্রুত ভাঙতে শুরু করবে আর তখনই এর মজাটা আপনি অনুভব করতে শুরু করবেন, কারণ তখন আপনার আর ক্ষুধা লাগবে না। দীর্ঘ সময় আপনি না খেয়ে থাকতে পারবেন। আপনার মস্তিষ্ক জেনে যাবে আপনার শরীরে জমে থাকা চর্বি হলো শক্তির এক বিরাট আধার, এখান থেকেই তো আমি আমার শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান সংগ্রহ করতে পারি, বাইরের খাবারের প্রয়োজন কী ?
তবুও আপনাকে খেতে হবে যে পরিমাণ খেতে বলা হয়েছে সেই পরিমাণ অথবা আপনার শরীরের চাহিদা অনুযায়ী।
তো বন্ধুরা এখন তো আর এই ব্যাপারটা নিয়ে কোন প্রশ্ন থাকার অবকাশ নেই কারণ আমি যথাসম্ভব চেষ্টা করেছি ফ্যাট এ্যাডপটেশনের প্রক্রিয়াটা ভালো ভাবে বুঝানোর জন্য। তবে আর দেরি কেন, সুস্থ সবল ভাবে বেঁচে থাকার জন্য আজই নিজেকে প্রস্তুত করুন এবং শুরু করে দিন ফ্যাট এ্যাডপটেশন বা অনাকাঙ্ক্ষিত চর্বি নির্মূল।