সেলিনা আখতার : একজন মায়ের জীবনে তাঁর সন্তানের লাশ দেখার মতো মর্মান্তিক, বেদনাদায়ক ঘটনা বোধ হয় পৃথিবীতে আর কিছু হতে পারে না। বুকে একটিমাত্র গুলির অব্যর্থ আঘাতে মিলন রাজপথে লুটিয়ে পড়েছিল। মিলনের গুলিবিদ্ধ স্থানের কথা স্মরণ করতে গিয়ে আমার চোখে আজও জ্বলজ্বল করে ভেসে ওঠে সে স্থানটি। অনেকটা জায়গাজুড়ে আমার প্রিয় সন্তানের বুকের ছোপ ছোপ রক্তে যেন বাংলাদেশের মানচিত্রের ছবি ভেসে উঠেছিল। ২৯ বছর ধরে এ দৃশ্য আমি ভুলতে চেয়েছি। কিন্তু পারিনি, এ দেশের ও সমাজের মানুষগুলো আমাকে ভুলতে দেয়নি। মিলনের হত্যার সঙ্গে জড়িত রাজনৈতিক শক্তি দেশের রাজনীতিতে পুনর্বাসিত হয়েছে। গণতন্ত্রের লেবাস পরে এর নেতারা সংসদের আসন অলংকৃত করেছেন। এই হত্যার কোনো বিচার হয়নি। সে কারণেই হয়তো তাঁর দলের একজন নেতা কিছুদিন আগে শহীদ নূর হোসেন সম্পর্কে সদর্পে উচ্চারণ করেছেন ‘নূর হোসেন একজন ইয়াবাখোর নেশাখোর ছিল।’ অপর একজন নেতা (সেই দলেরই) শহীদ মিলন সম্পর্কে বলেছেন, ‘মিলনকে হত্যা করা হয়েছে কি না, সেটা বিতর্কিত বিষয়।’

অথচ ডা. মিলন হত্যার ব্যাপারে কোনো বিতর্কের অবকাশ নেই। ওর ময়নাতদন্তের রিপোর্টে উল্লেখ আছে পরিষ্কারভাবে, একটি ‘৩০৩’ বুলেট মিলনের হৃৎপিণ্ড ভেদ করে রক্তক্ষরণ ঘটায়। ৩০৩ বুলেট কাদের কাছে থাকে, তা দেশবাসী জানে।

দেশের জন্য, জাতির জন্য যারা নিঃস্বার্থভাবে জীবন উৎসর্গ করে গেল, তাদের সম্পর্কে অশালীন উক্তি করতেও এরা দ্বিধাবোধ করেন না। ক্ষমতায় যাওয়ার কূটকৌশল জানাটা এঁদের প্রধান লক্ষ্য। মিলন হত্যার পর দীর্ঘ ২৯ বছর পার হয়েছে। বারবার চেষ্টা করেও আজ পর্যন্ত শহীদ মিলনের স্মৃতি রক্ষায় একটি রাস্তার নামকরণ করা সম্ভব হয়নি। গত বছর ঢাকা দক্ষিণের মেয়রকে বলা হয়েছিল। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, কোনো রাস্তার নামকরণ করা সম্ভব হবে না। একজন সৎ, আদর্শবান, রাজনীতিসচেতন, নির্লোভ ব্যক্তিত্বের অধিকারী শহীদকে শ্রদ্ধা জানাতে যে জাতি ব্যর্থ হয়, সে জাতির তরুণেরা দেশপ্রেমে কখনো উদ্বুদ্ধ হয় না।

মিলন আজীবন সংগ্রাম করেছিল, আন্দোলন করেছিল এ দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য, মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা ও শৃঙ্খলিত জাতিকে মুক্ত করার জন্য। ১৯৯০-এর ২৭ নভেম্বর মিলন নিজের জীবন উৎসর্গ করে গণমানুষের সেই মুক্তির দুয়ার খুলে দিয়েছিল। শৃঙ্খলমুক্ত জাতি সেদিন আনন্দ-উল্লাসে রাজপথ প্রকম্পিত করেছিল। আর আমার পরিবারের সবার হৃদয়ে ছিল মরুভূমির হাহাকার। সে দিনগুলো আমার হৃদয়াকাশে কোনো দিন ম্লান হওয়ার নয়। হৃদয়ের নীরব রক্তক্ষরণ আজীবন আমাকে কাঁদাবে।

মনে মনে ভাবি, মিলনের স্বপ্নগুলোকে যদি আমি বাস্তবায়ন করতে পারতাম, তাহলে হয়তোবা এ ক্ষরণ কিছুটা লাঘব হতো। কিন্তু আমি অক্ষম এক মা, যার শারীরিক বা মানসিক কোনো শক্তিই আজ আর অবশিষ্ট নেই। জীবনসায়াহ্নের এ বেলায়, আমার ছেলের স্বপ্নপূরণের সাধ্য আমার কোথায়? সমাজ আর রাষ্ট্রের সে দায়িত্ব পালনের কথা! কিন্তু তারা তা পালনে ব্যর্থ হয়েছে। মিলনের স্মৃতি রক্ষার্থে একটি সংগঠন গড়ার চেষ্টা করছি। ওর স্মৃতি রক্ষা করতে হলেও ওর স্বপ্নগুলোর কিছু অন্তত বাস্তবায়নের মাধ্যমে করতে হবে। কিন্তু কর্মীর অভাবে তা-ও এগিয়ে নিয়ে যাওয়া কঠিন মনে হচ্ছে। জানি না আমার হাতকে শক্তিশালী করার জন্য কতজনকে আমার পাশে পাব। বর্তমান সমাজে মানুষ বড় বেশি আত্মকেন্দ্রিক। কারও জন্য এতটুকু সময় ব্যয় করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না।

মিলন মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে হৃদয়ে ধারণ করেই রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়। যে আকাঙ্ক্ষা দেশের তরুণসমাজকে মুক্তিযুদ্ধে উজ্জীবিত করেছিল, তার কতটুকু বর্তমান সমাজে বিদ্যমান? কোথায় সমতাভিত্তিক সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা? বর্তমান সমাজে নেই মানবিক মূল্যবোধ, নেই ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা, প্রশাসনে নেই স্বচ্ছতা, শিক্ষার মানে ধস নেমেছে। দেশের তরুণসমাজ আজ মাদকাসক্ত, অবৈধভাবে ক্যাসিনো ব্যবসা চলেছে দীর্ঘদিন। দেশ থেকে কোটি কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যায়। দুর্নীতিতে বাংলাদেশ আজ বিশ্বদরবারের সম্মুখ কাতারে স্থান করে নিয়েছে। বর্তমান সমাজে নারী ও শিশুর জীবনও নিরাপদ নয়। স্বাস্থ্য খাতেও চলছে চরম নৈরাজ্য।

সামরিক শাসনের অবসানের ২৯ বছর অতিক্রান্ত হচ্ছে। বলা হচ্ছে, আমরা উন্নয়নের মহাসড়কের দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছি। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষা কি পূর্ণতা পেয়েছে? সমাজ আজ স্পষ্টত দুটি ভাগে বিভক্ত। ধনী আরও ধনী হয়েছে, দেশের ধন-সম্পদ গুটিকয় মানুষের কুক্ষিগত। কাঠামোগত উন্নয়নই উন্নয়ন নয়। সাধারণ মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন, তাদের সুখ-শান্তি ও নিরাপত্তার উন্নয়নই প্রকৃত উন্নয়নের মাপকাঠি। সমাজে নৈতিক ও গণতান্ত্রিক উন্নয়ন ঘটেনি। মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটছে প্রতিনিয়ত। তরুণসমাজের কিছু অংশ আজ বিপথগামী। তরুণসমাজের এ অবক্ষয় রোধে সমাজ ও রাষ্ট্রের যেমন দায়িত্ব রয়েছে, তেমনি রয়েছে পরিবারের। এ ক্ষেত্রে পরিবারের দায়িত্বটাই বেশি। প্রতিটি পরিবারের দায়িত্ব তাদের সন্তানদের ওপর সজাগ দৃষ্টি রাখা। কিশোর বয়স থেকেই মাতা–পিতা সন্তানের মনে সামাজিক, মানবিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধগুলো যদি জাগাতে সক্ষম হন, তাহলে সন্তানেরা সঙ্গদোষে বা পারিপার্শ্বিকতা থেকে অনৈতিক কিছু শিখলেও তা তাদের চরিত্রকে ততটা প্রভাবিত করতে পারে না।

মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি সুস্থ, সুন্দর সামাজিক জীবন দেওয়ার দায়িত্ব আপনার, আমার সবার। তাই প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সব ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে নৈতিক জাগরণ, সুস্থ জীবনাদর্শের চর্চা, দেশপ্রেমের শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলার কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। এখানে একটি বিষয় উল্লেখ না করলেই নয়। ক্রমাগত বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও গণতন্ত্রহীনতা বর্তমান সমাজে মূল্যবোধের অবক্ষয়ের অন্যতম কারণ। মনে রাখতে হবে, পাকিস্তান আমলে আইয়ুব খানের থিওরিও ছিল গণতন্ত্র নয়, দেশের জন্য উন্নয়নই আসল। আইয়ুব খানের সেই নীতির পরিণতি কী হয়েছে, তা আমরা সবাই জানি।

সেলিনা আখতার ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে শহীদ ডা. শামসুল আলম খান মিলনের মা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *