ড. তৌফিক জোয়ার্দার : আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা সম্পর্কে যে আলোচনা হয়—তার মূলসূত্র হলো ইউনিভার্সাল হেলথ কভারেজ বা সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নামক একটি ধারণা। এ ধারণাটি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার অন্যতম একটি লক্ষ্য হিসেবে স্থান পেয়েছে, এবং বাংলাদেশ সরকার ২০৩২ সালের মধ্যে সে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ব্যাপারে প্রতিশ্রুতিশীল। সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার অর্থ হলো—সব মানুষ, যেখানেই সে থাকুক না কেন, অর্থনৈতিক চাপের সম্মুখীন না হয়েই মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পাবার দাবিদার। এর তিনটি মাত্রা—১. সার্ভিস কভারেজ বা সেবার পরিধি বাড়ানো ২. পপুলেশন কভারেজ বা অধিক সংখ্যক মানুষকে সেবার আওয়তায় নিয়ে আসা এবং ৩. কস্ট কভারেজ বা সেবাগুলো যেন সাশ্রয়ী হয় তা নিশ্চিত করা। আর এই স্বাস্থ্যসেবাকে হতে হবে মানসম্মত।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য পরিস্থিতির দিকে তাকালে আমরা দেখি, দেশটিতে অসুস্থতার দ্বৈতচাপ বিরাজ করছে। তার মানে হলো, এটি এমন একটি দেশ যেখানে হূদরোগ (প্রতি লাখে ২০২ মৃত্যু), ক্যানসারের (প্রতি লাখে ৬৩ মৃত্যু) মতো অসংক্রামক রোগের যেমন বিস্তার ঘটেছে; তেমনই প্রসূতিমৃত্যু ও শিশুমৃত্যু (প্রতি লাখে ৩৭ মৃত্যু), শ্বাসতন্ত্রের প্রদাহ ও যক্ষ্মার (প্রতি লাখে ৩৩ মৃত্যু) প্রাদুর্ভাব এখনো দোর্দণ্ড প্রতাপে বিরাজমান। অথচ এধরনের পরিস্থিতি মোকাবেলায় সেবার পরিধি এখনো অপ্রতুল, বিশেষ করে আমাদের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা এখনো অসংক্রামক ব্যাধি মোকাবেলায় যথেষ্ট সক্ষম নয়। প্রচুর মানুষ (জনস্বাস্থ্য গবেষক অ্যান ক্রফটের ২০০৭ সালের গবেষণা অনুযায়ী দেশের মোট স্বাস্থ্যসেবার ৮৭ শতাংশ) বেসরকারি খাত থেকে সেবা গ্রহণ করে, যা নিদারুণভাবে অনিয়ন্ত্রিত। বিশেষ করে নগর এলাকায় সরকারি খাতের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নেই বললেও অত্যুক্তি হয় না।

বাংলাদেশ বিগত কয়েক দশকে স্বাস্থ্য খাতে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে। যেমন, গড় আয়ু ১৯৭০-এর দশকে ৪৭ বছর থেকে বর্তমানে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭২ বছরে, যা প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে বেশি। নবজাতক মৃত্যু, শিশুমৃত্যু, প্রসূতিমৃত্যু—এসব সূচকেই অর্জিত হয়েছে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। কিন্তু এসব স্বাস্থ্য সূচকে অগ্রগতি হলেও, স্বাস্থ্য অর্থনীতিসংক্রান্ত সূচকগুলোতে বাংলাদেশের অগ্রগতি যথেষ্ট আশাব্যঞ্জক নয়। আর এই সূচকগুলোই সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা অর্জনে বড়ো ভূমিকা রেখে থাকে। কাজেই এ সূচকগুলোতে উন্নয়ন ঘটাতে না পারলে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন দুরূহ হয়ে পড়বে।

সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা অর্জনে একটি দেশ কতটা এগিয়েছে তা বোঝার অন্যতম একটি নির্ণায়ক হলো, স্বাস্থ্যের পেছনে ব্যয় করা অর্থের কত শতাংশ অর্থ নিজ পকেট থেকে ব্যয় করা হয়। বলাই বাহুল্য, এই মাত্রাটি যত কম হয়, মানুষের জন্য ততই ভালো। দুঃখজনক হলো, বিশ্বব্যাংকের ২০১৬ সালের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে এর মাত্রা ৭২%, যা বিশ্বের মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ। থাইল্যান্ডে এই মাত্রা ১২% (অর্থাত্ থাইল্যান্ডে স্বাস্থ্যরক্ষায় সর্বমোট যে ব্যয় করা হয়, তার মধ্যে সাধারণ মানুষ মাত্র ১২% সার্ভিস পয়েন্টে নিজ পকেট থেকে ব্যয় করে; বাকিটা সরকার, ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি অথবা দাতাসংস্থা বহন করে), কিউবা ও ফ্রান্সে ১০%, রুয়ান্ডায় ৬%, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১১%, দক্ষিণ এশিয়ার গড় ৬৪%, নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলোর গড় ৫৬%।

বাংলাদেশে সরকারি স্বাস্থ্যসেবা তাত্ত্বিকভাবে বিনামূল্যে প্রদান করা হলেও বাস্তবিক ব্যয় যে অনেক বেশি তা ওপরের চিত্র থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়। দেশের মোট জিডিপির মাত্র ২.৬৪% স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় হয়, যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন। কোনো কার্যকর ইন্স্যুরেন্স অথবা প্রিপেমেন্টভিত্তিক পদ্ধতি নেই বললেই চলে; ফলে বছরে ৯% পরিবার স্বাস্থ্যজনিত ব্যয়-বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়, ৫.৬% মানুষ নেমে যায় দারিদ্র্যসীমার নিচে, ৭% মানুষ স্বাস্থ্যব্যয় মেটাতে গিয়ে সম্পদ বিক্রি করতে বাধ্য হয়। সরকারি সেবার মান আশানুরূপ না হওয়ায় অনেক মানুষ বাধ্য হয়ে বেসরকারি খাতের শরণাপন্ন হয়, যেখানে ৯৩% ব্যয়ই নির্বাহ করতে হয় তত্ক্ষণাত্ নিজ পকেট থেকে (বাকি অংশ ইন্স্যুরেন্স, সমাজসেবা খাত বা অন্য কোনো উত্স থেকে নির্বাহ হয়)।

সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হলো একুইটি বা ন্যায্যতা। এর মানে হলো, জনগোষ্ঠীর কোনো অংশ অন্য অংশের চেয়ে অন্যায্যভাবে বৈষম্যের শিকার হবে না, বিশেষ করে এধরনের বৈষম্য স্পষ্টত পরিহারযোগ্য। বাংলাদেশ জনমিতিক ও স্বাস্থ্য জরিপ ২০১৪’র উপাত্ত থেকে দেখা যায়, বেশিরভাগ স্বাস্থ্য সূচকে উন্নতি হলেও অর্থনৈতিক অবস্থান, শিক্ষাগত যোগ্যতা, আবাসস্থল (নগর বনাম গ্রাম), ভৌগোলিক অবস্থান (বিভিন্ন বিভাগ) ইত্যাদির ভিত্তিতে সূচকগুলোতে ব্যাপক বৈষম্য বিদ্যমান। উদাহরণস্বরূপ :সচ্ছল জনগোষ্ঠীতে মেয়েদের বিয়ের গড় বয়স যেখানে ১৭.৬ বছর, দরিদ্রতম জনগোষ্ঠীতে তা মাত্র ১৫.৩ বছর। শিক্ষিত জনগোষ্ঠীতে (মাধ্যমিক ও তদূর্ধ্ব) সন্তানের কাঙ্ক্ষিত সংখ্যার গড় যেখানে ২, অশিক্ষিত জনগোষ্ঠীতে তা ২.৪। রংপুর বিভাগে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহারকারীর হার যেখানে ৬৯.৮%, সিলেটে তা মাত্র ৪৭.৮%। সচ্ছল জনগোষ্ঠীতে এক বছরের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যুহার যেখানে প্রতি হাজারে ১৪, দরিদ্রতম জনগোষ্ঠীতে তা দ্বিগুণেরও বেশি—৩৫%। নগর এলাকায় দক্ষ সেবা প্রদানকারীর কাছ থেকে প্রসূতিসেবা গ্রহণকারী মায়েদের হার যেখানে ৭৮.৮%, গ্রাম এলাকায় তা মাত্র ৫৮.৬%। এভাবে প্রায় প্রত্যেকটি সূচকেই বৈষম্যের এই অশুভ চিত্রটি প্রকটভাবে ফুটে উঠেছে।

বাংলাদেশের সংবিধান এদেশের সব নাগরিকের জন্য বৈষম্যহীন স্বাস্থ্যসেবা প্রদানে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। সেই প্রতিজ্ঞা পূরণের কি কোনোই রাস্তা নেই? আশার বিষয় হলো, এসব স্বাস্থ্য-বৈষম্যকে পরাভূত করে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার দিকে অগ্রসর হবার জন্য বাংলাদেশ সরকার বেশকিছু নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। এর সঙ্গে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, দাতাগোষ্ঠী, উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান, এমনকি মিডিয়াও সহায়তার প্রতিশ্রুতি নিয়ে সামিল হয়েছে। প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ গণমাধ্যম-কর্মীদের মাঝে এ বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে ২০১৬ সালে প্রকাশ করেছে ‘স্বাস্থ্য সন্ধান :সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা বিষয়ক গণমাধ্যম সহায়িকা’ নামক সহজবোধ্য অথচ তথ্যপূর্ণ একটি বই। তবে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা বিষয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পলিসি ডকুমেন্টটি হলো স্বাস্থ্য ও পারিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিট কর্তৃক প্রকাশিত ‘স্বাস্থ্য সেবা অর্থায়ন কৌশলপত্র ২০১২-২০৩২’ (ঐবধষঃয ঈধত্ব ঋরহধহপরহম ঝঃত্ধঃবমু ২০১২-২০৩২: ঊীঢ়ধহফরহম ঝড়পরধষ চত্ড়ঃবপঃরড়হ ভড়ত্ ঐবধষঃয ঃড়ধিত্ফং টহরাবত্ংধষ ঈড়াবত্ধমব)। এই কৌশলপত্রে রিসোর্স পুলিং তথা একটি সর্বজনীন স্বাস্থ্য ফান্ড সৃষ্টি এবং কর্মদক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে স্বাস্থ্য খাতে অর্থের জোগান বৃদ্ধির ব্যাপারে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। বৈষম্যের বিষয়টি এখানেও স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে এবং এ থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে করভিত্তিক বাজেটের সঙ্গে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির অর্থায়নের সংযোগ সাধনের পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে। সেইসঙ্গে কমিউনিটি ভিত্তিক স্বাস্থ্যবীমা ও অন্যান্য প্রিপেমেন্টভিত্তিক অর্থায়ন পদ্ধতির মাধ্যমে দরিদ্রতম জনগোষ্ঠী ও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী থেকে শুরু করে ক্রমান্বয়ে গোটা জনগোষ্ঠীকে হেলথ কভারেজের আওতায় নিয়ে আসার প্রস্তাব করা হয়েছে।

শুধু নীতি প্রণয়নই নয়, নীতির বাস্তবায়নেরও কিছু পদক্ষেপ ইতিমধ্যে দৃষ্টিগোচর হওয়া শুরু করেছে। যেমন, টাঙ্গাইল জেলার কালিহাতি, ঘাটাইল ও মধুপুর উপজেলায় ‘স্বাস্থ্য সুরক্ষা কর্মসূচি’ নামে স্বাস্থ্য অর্থায়নের একটি পাইলট প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে প্রথমে দারিদ্র্যসীমার নিচের মানুষদেরকে অর্ধশতাধিক রোগের বিনামূল্যে চিকিত্সাসেবার আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে। সরকার তাদের প্রিমিয়াম প্রদানের দায়িত্ব নিয়েছে। ক্রমান্বয়ে দারিদ্র্যসীমার ওপরের মানুষদেরকেও এর আওতাভুক্ত করার পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে।

তবে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা বাস্তবায়নের পথে প্রতিবন্ধকতাও নেহাত কম নয়। এসব প্রতিবন্ধকতাকে তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায় : ১. বৃহত্তর নীতিমালা (ঢ়ড়ষরপু) স্তরের প্রতিবন্ধকতা, ২. বাস্তবায়ন বিষয়ক প্রতিবন্ধকতা এবং ৩. জনগণের মাঝে এ বিষয়ে চাহিদা সৃষ্টি না হওয়া জনিত প্রতিবন্ধকতা। এগুলোর মধ্যে প্রথম প্রতিবন্ধকতাটি কেবলমাত্র স্বাস্থ্য খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। যেমন, বাংলাদেশের পাবলিক ফিন্যান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট এমনভাবে সংগঠিত হয়ে আছে যে, কেবলমাত্র স্বাস্থ্য খাতের জন্য এই ব্যবস্থার পরিবর্তন অত্যন্ত জটিল এবং উচ্চ পর্যায়ের রাজনৈতিক অঙ্গীকারের মুখাপেক্ষী। অথচ এধরনের পরিবর্তন ছাড়া সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এর জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টতাও প্রয়োজন। দ্বিতীয় ধারার প্রতিবন্ধকতা, তথা বাস্তবায়ন বিষয়ক প্রতিবন্ধকতার মধ্যে পড়ে মানবসম্পদজনিত সংকট (অপ্রতুলতা, প্রশিক্ষণের অভাব, গ্রামে থাকতে না-চাওয়া, স্কিল-মিক্সের ভারসাম্যহীনতা, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ইত্যাদি), মনিটরিংয়ের অভাব, প্রোটোকল না-থাকা অথবা না-মানা (চিকিত্সা, রেফারেল, ফলোআপ, এমনকি স্বাস্থ্য খাতের সাধারণ ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত) ইত্যাদি।

তবে সবচেয়ে অবহেলিত যা, তা হলো, জনগণের মাঝে তাদের নিজেদের জন্যই যা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, সেই বিষয়ে উদাসীনতা, তথা চাহিদার অভাব। ঐতিহাসিকভাবে এদেশের মানুষের মাঝে পারস্পরিক সংহতি ও আস্থার অভাব রয়েছে; তার পেছনে যদিওবা কারণও রয়েছে। সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য অন্যতম শর্ত হলো একটা রিসোর্স পুল সৃষ্টি করা, যেখানে তারা তাদের সাধ্যানুযায়ী আয়ের একটা অংশ জমা করতে থাকবে, সে অসুস্থ হোক বা না হোক। সেই পুল থেকে যেকোনো অসুস্থ ব্যক্তি তার প্রয়োজন অনুযায়ী স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় নির্বাহ করবে। প্রথমত, সংহতির অভাবহেতু মানুষ নিজের আয়ের অংশ দিয়ে অন্য আরেকজনের চিকিত্সা ব্যয় নির্বাহের ধারণাটি সহজভাবে নিতে পারেন না। দ্বিতীয়ত, কোনো এক ভবিষ্যত্ সময়ে তার প্রয়োজনের মুহূর্তে সে এই পুল থেকে সুবিধা নিতে পারবে কি না, সেই আস্থার সংকটে মানুষ ভোগে। কিন্তু এমন একটি পদ্ধতি যে দীর্ঘমেয়াদে তার নিজের কাজেই সবচেয়ে বেশি আসবে, এবং আধুনিক একটি স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গঠনকল্পে এর যে কোনো বিকল্পও নেই, সেই বোধ মানুষের ভেতর এখনো অনুপস্থিত। মানুষের নিজ স্বাস্থ্য অধিকার সম্পর্কে অজ্ঞতা, অসচেতনতা এবং ক্ষমতাহীনতা সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা অর্জনের পথে অন্যতম অন্তরায়।

তাহলে এসব প্রতিবন্ধকতা থেকে উত্তরণের উপায় কী? তা জানতে এই নিবন্ধের লেখক এক গবেষণার সূত্র ধরে কথা বলেন সরকারের স্বাস্থ্য খাতের উচ্চপদস্থ ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তা, আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যসংস্থা ও দাতাগোষ্ঠী, বেসরকারি ও বাস্তবায়ন প্রতিষ্ঠান, গবেষণা ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং স্বাস্থ্যসাংবাদিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে। উপরোল্লিখিত প্রতিবন্ধকতাগুলোর সাপেক্ষে তারা তাদের সুচিন্তিত পরামর্শ তুলে ধরেন। যেমন :বৃহত্তর নীতিমালাসংক্রান্ত প্রতিবন্ধকতাসমূহ নিরসন করার লক্ষ্যে তারা বলেন, বাংলাদেশের পাবলিক ফিন্যান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট সম্পূর্ণ ঢেলে সাজাতে হবে, স্বাস্থ্য অর্থায়ন পদ্ধতির সংস্কার সাধন করতে হবে (জাতীয় সিঙ্গেল পেয়ার পদ্ধতি চালু করে ক্রমান্বয়ে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষকে সেবার পরিধির আওতায় নিয়ে আসতে হবে; পার্চেজিং বডি সৃষ্টি করে পার্চেজার ও প্রোভাইডারের জন্য পৃথক সংস্থা রাখতে হবে; উদ্ভাবনী অর্থায়ন পদ্ধতি যেমন কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি, জাকাত, সিন ট্যাক্স বা পাপ কর ইত্যাদির টাকা সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ব্যয় করতে হবে)। আমাদের দেশে বেসরকারি স্বাস্থ্য খাত একরকম নিয়ন্ত্রণহীন বললেই চলে। মানুষের স্বাস্থ্য অধিকার ক্ষুণ্ন হলে, অপচিকিত্সার সম্মুখীন হলে মানুষের অভিযোগ জানানোর এবং প্রতিকার প্রাপ্তির ব্যবস্থাও বলতে গেলে অনুপস্থিত। কাজেই রেগুলেটরি ও মেডিয়েটরি বডি সৃষ্টি করতে হবে; বাড়াতে হবে বহুখাতভিত্তিক সহযোগিতা, নিশ্চিত করতে হবে রাজনৈতিক অঙ্গীকার।

এদিকে বাস্তবায়ন বিষয়ক প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করতে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে গড়ে তুলতে হবে, স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থাপনা, মনিটরিং ও সুপারভিশন বাড়াতে হবে। স্বাস্থ্যসেবায় তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে, প্রতিকারের সঙ্গে সঙ্গে রোগ প্রতিরোধে আরো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে, সেবার মান বাড়াতে কোয়ালিটি ক্রাইটেরিয়া বেঁধে দিয়ে তার প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে, সেবা প্রদানকারীর কোড অব কনডাক্ট সুনির্দিষ্ট করতে হবে, বাড়াতে হবে কর্মদক্ষতা বা এফিশিয়েন্সি। দেশের আনাচে-কানাচে দুর্গম এলাকা ও জনগোষ্ঠীর দিকে সচেতনভাবে বিশেষ নজর দিতে হবে, সেবার বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। জনগণের মাঝে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা বিষয়ে চাহিদা সৃষ্টির লক্ষ্যে সেবাগ্রহীতাকে শিক্ষিত করে তুলতে হবে, তার ক্ষমতায়নের বিষয়ে নজর দিতে হবে। আর এইসব বিষয়ে দেশীয় প্রেক্ষাপটকে মাথায় রেখে গবেষণা এবং সরকারের সঙ্গে অ্যাডভোকেসি চালিয়ে যেতে হবে।

সরকারের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারক মহলের অঙ্গীকারের বদৌলতে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষাসংক্রান্ত নীতিমালা এবং কৌশলপত্র প্রশংসার দাবি রাখে। তথাপি, পাবলিক ফিন্যান্সিয়াল ম্যানেজমেন্টের আমূল পরিবর্তন জরুরি। আর জরুরি হলো গণমানুষের কোটি কণ্ঠে নিজ স্বাস্থ্য অধিকারের স্বপক্ষে সোচ্চার আওয়াজ তোলা। দেশীয় প্রেক্ষাপটকে মাথায় রেখেই নীতিনির্ধারকদেরকে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা তথা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে পদক্ষেপ নিতে হবে। আমাদের অঙ্গীকার হোক, ‘দেশের একজন মানুষও অর্থের অভাবে স্বাস্থ্যের অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে না।’

লেখক : জনস্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থা বিশেষজ্ঞ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *