ডাঃ ফারুকুজ্জামান : এক বছর আগের কথা। হালিমা বেগম (৩৩ বছর) । গায়ের এক গৃহবধূ। খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হলেন স্তন ক্যান্সারের শেষ পর্যায় নিয়ে। ক্যান্সার ইতিমধ্যে ছড়িয়ে গেছে ফুসফুস, যকৃৎ সহ শরীরের অন্যান্য স্থানে। জীবন-মৃত্যুর সন্ধ্যিক্ষন। “স্যার আপনি কি আমাকে ভালো করে দিতে পারেন?” প্রায় আমাদের কাছে জিজ্ঞেস করতেন তিনি। আমি তাকে নানা রকম আশার বাণী শুনাতাম প্রায় প্রতিদিনই । ওয়ার্ডের রাউন্ডে আমি বরাবরই বাংলা ভাষা ব্যবহার করি। কিন্তু এই রোগীর পাশে আমি সব সময় আমাদের ডাক্তারদের সাথে রোগীর ব্যাপারে কথা বলতে ইংরেজি ব্যবহার করতাম, যাতে তিনি আমার কথা না বোঝেন। জানতে পারলাম, তার স্তন ক্যান্সার আজ থেকে দুই বছর আগে ধরা পড়েছিল। আমাকে দুই বছর আগের এক চিকিৎসকের একটা প্রেসক্রিপশন বের করে দিলেন। দেষলাম লেখা আছে, প্রাথমিক পর্যায়ের স্তন ক্যান্সার। এই চিকিৎসক তাকে তখন অপারেশন করে আক্রান্ত স্তন ফেলে দিলে বলেছিলেন। জিজ্ঞাসা করলাম, “তখন চিকিৎসা শুরু করলেন না কেন?” জানালেন এক দুঃখের ইতিহাস।
দুই বছর আগে রোগ ধরা পড়ার পর তার স্বামী, জোবের আলী অপারেশন করে স্তন ফেলে দেবার ব্যাপারটায় ঠিক রাজি ছিলেন না। তাই হাসপাতাল থেকে তাকে তিনি নিয়ে যান এক হোমিও ডাক্তারের কাছে। তারপর বাসায় বসে শুরু হয় কবিরাজি চিকিৎসা। ৩ মাস আগে অবস্থা বেশি খারাপ হলে, তার স্বামী তাকে ডিভোর্স দেন। আবার নতুন করে বিয়ে করেছেন তিনি ইতিমধ্যে। তিনি তার পঞ্চম শ্রেণী পড়ুয়া ছেলেকে নিয়ে এখন বসবাস করছেন। আত্মীয়-স্বজন খুব একটা সাহায্য করছে না, বিশেষ করে অর্থনৈতিক ভাবে। কয়েকদিন পর আমাকে তিনি খুব অদ্ভুত একটা অনুরোধ করে বসলেন, “আমার ছেলেটার বেশ কিছুদিন আগে এপেন্ডিসাইটিস ধরা পড়েছে। আপনি কি পারেন আমার মৃত্যুর আগে তার অপেরেশনটা এই হাসপাতালে করিয়ে দিতে। আমি জানি, আমি মারা যাচ্ছি। বেশি সময় নাই। আপনিও জানেন। তাই আমার বিছানার পাশে ইংরেজিতে কথা বলেন, যাতে আমি না বুঝি।”
গত অক্টোবর মাস ছিলো স্তন ক্যান্সার সচেতনতার মাস। গোলাপি পোস্টার, ব্যানার, ফেস্টুনে ছেয়ে গেছে আমাদের শহর। গোলাপি পোশাকে আমরা মাস জুড়ে অংশ গ্রহণ করেছি বিভিন্ন শোভাযাত্রায়। আসলে স্তন ক্যান্সার মরণঘাতী রোগ। কিন্তু এই রোগ সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য, যদি তা প্রাথমিক পর্যায়ে সনাক্তকরণ করা যায় এবং সময়মতো সঠিক চিকিৎসা শুরু করা যায়। আসুন “প্রাথমিক পর্যায়” কথাটা আরেকটু পরিষ্কার করি । স্তন ক্যান্সারের ৪ টি পর্ব: ১ম, ২য়, ৩য় এবং ৪র্থ । ১ম ও ২য় পর্যায়ে এই রোগ অপারেশনের মাধ্যমে সম্পূর্ণ নিরাময় করা সম্ভব। ৩য় পর্যায়েও অনেক ক্ষেত্রে এই রোগ নিরাময়যোগ্য, কিন্তু শর্ত সাপেক্ষে (কেমোথেরাপি/রেডিওথেরাপি/হরমোন থেরাপি)। ৪র্থ পর্যায়ে সামগ্রিকভাবে আরোগ্য অসম্ভব। “প্রাথমিক পর্যায়” বলতে সাধারণভাবে ১ম ও ২য় পর্যায়কেই বোঝানো হয়।
এবার আসা যাক আমার মূল বক্তব্যে। আসল বাস্তবতায়। পুরুষ শাসিত আমাদের সমাজ ব্যাবস্থার আনাচে কানাচে লুকিয়ে আছে এমনও হাজারো হালিমা বেগমের গল্প, যারা বিভিন্ন সময়ে নানাভাবে তীব্র অবহেলা-বঞ্চনার শিকার। কখনো স্বামীর কাছ থেকে, কখনো বা পরিবার, আত্বীয়-স্বজন কিংবা শ্বশুরালয় থেকে। কালস্রোতে এই গল্পগুলো এক সময় এদের মতো হারিয়ে যায়। এ অবস্থা থেকে বের হওয়ার একমাত্র উপায় সমাজের জোবের আলীদের জেগে ওঠা। এটা মোটেই সহজ কাজ নয়। তাই আমার ব্যক্তিগত উপলব্ধি হলো, স্তন ক্যান্সার সচেতনতা কর্মসূচিতে নারীদের পাশাপাশি পুরুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণ, সচেতনতা বৃদ্ধি করা, জোবের অলিদের জাগিয়ে তোলা। স্তন ক্যান্সার-এর চিকিৎসা থেকে শুরু করে সকল ব্যাপারে তাদের অন্তর্ভুক্ত করা । তা না হলে অক্টোবর মাস সারা দেশ গোলাপি কাগজে মুড়ে ফেললেও, তার সামগ্রিক ফলাফল শুন্যই হবে। জোবের অলিরা জেগে উঠলে, এই যুদ্ধে আমাদের জয়ী হওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র। হালিমা বেগম আজ আমাদের মাঝে নেই। আমার বলতে এতটটুকুও লজ্জা নেই যে, মাত্র কয়েকদিনে গাঁয়ের এই অশিক্ষিত গৃহবধূ আমাকে যা শিখিয়ে দিয়ে গেলেন, তা এতো বছরেও সার্জারির মোটা মোটা বই বা গবেষণাপত্র আমাকে শেখাতে পারেনি।

ডাঃ ফারুকুজ্জামান
এমবিবিএস (সিএমসি), বিসিএস (স্বাস্থ্য),
এফসিপিএস (সার্জারি),
এমআরসিএস (এডিনবার্গ, ইংল্যান্ড),
এমএস (সার্জারি)- বারডেম হাসপাতাল, ঢাকা
সহকারী রেজিস্ট্রার,
সার্জারি বিভাগ। খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *