ডায়ালাইসিস সেবা হঠাৎ বন্ধ করে দেওয়ায় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন কিডনি রোগী ও স্বজনরা।
বুধবার দুপুরের রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত জাতীয় কিডনি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সামনে এ ঘটনা ঘটে। হাসপাতাল পরিচালকের মধ্যস্থতায় দীর্ঘ ৭ ঘণ্টা পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। এদিন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও এ ঘটনা ঘটে।
জানা যায়, পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই জাতীয় কিডনি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে ডায়ালাইসিস হবে না বলে জানানো হয়। এতে দূর-দূরান্ত থেকে আসা রোগীরা বিপদে পড়েন।
কবে থেকে ডায়ালাইসিস হবে সেটিও নিশ্চিত করা হচ্ছিল না। এতে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত রোগীদের ভোগান্তি পোহাতে হয়। এমন পরিস্থিতিতে হাসপাতালের সামনে মিরপুর সড়ক অবরোধ করেন তারা।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জাতীয় কিডনি ইনস্টিটিউটে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) প্রকল্পের মাধ্যমে রোগীদের ডায়ালাইসিস কার্যক্রমে নিয়োজিত রয়েছে ভারতীয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সেন্ডর। কোম্পানিটি বকেয়া টাকার জন্য সেবা বন্ধ করে দেয়।
পরে বিলসংক্রান্ত বিষয়ের সুরাহা হলে বেলা ৩টার পর আবার সেবা দেওয়া শুরু হয়। এক যুগেরও বেশি সময় ধরে নিয়মিত ডায়ালাইসিস করান আল আমিন বারী নামের এক রোগী। তিনি বলেন, ‘ডায়ালাইসিস নিতে দেরি হলেই শ্বাসকষ্ট বেড়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গে ডায়ালাইসিস করাতে না পারলে জীবনমরণ সমস্যা হয়ে যায়। এ হাসপাতালে কিছুটা স্বল্প খরচে ডায়ালাইসিস করি। কিন্তু তারা প্রায়ই রোগীদের ঝামেলায় ফেলে।
জসিম উদ্দিন লিটন নামের আরেক রোগী বলেন, ‘কিছুদিন পরপরই এরা টাকার জন্য ডায়ালাইসিস বন্ধ রাখে। তাতে আমাদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
জানতে চাইলে সেন্ডরের প্রধান হিসাবরক্ষক জসীমউদ্দীন বলেন, ২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর পরিচালিত পিপিপি প্রকল্পের ভিত্তিতে সেন্ডর কোম্পানি স্বল্প খরচে রোগীদের ডায়ালাইসিস দিয়ে যাচ্ছে। এ কাজে বাংলাদেশ সরকার ভর্তুকি দিচ্ছে। কিন্তু বেশ কিছুদিন ধরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তাদের প্রয়োজনীয় অর্থ সহায়তা দেওয়া বন্ধ রেখেছে। বিষয়টা নিয়ে হাসপাতাল পরিচালকের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক হলেও সমস্যা সমাধান হয়নি। এদিকে ওষুধ সরঞ্জাম সরবরাহ সংশ্লিষ্টরা টাকা না দেওয়ায় সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে বাধ্য হয়েই আজ ডায়ালাইসিস সেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়।
এমন ঘটনায় চিকিৎসা নিতে আসা ক্ষুব্ধ রোগী ও স্বজনরা হাসপাতালের সামনের সড়ক অবরোধ করেন। এতে করে এলাকাজুড়ে যানজট সৃষ্টি হয়। দুপুর ২টার দিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। পরে কর্তৃপক্ষের আশ্বাসে আবার ডায়ালাইসিস সেবা চালু হয়।
জাতীয় কিডনি হাসপাতালের ডায়ালাইসিস ইউনিটের ইনচার্জ মহিতুন বেগম বলেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে পাওনা টাকা পরিশোধের জন্য সেন্ডর বেশ কয়েকবার তাগাদা দিয়েছে। ৫ জানুয়ারির পর ডায়ালাইসিস করতে পারবে না বলে জানিয়েছিল প্রতিষ্ঠানটি।
সর্বশেষ মঙ্গলবার ডায়ালাইসিস বন্ধের একটি নোটিশও দেয়। তাতেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কোনো ধরনের পদক্ষেপ নেয়নি। হাসপাতালের একজন চিকিৎসক বলেন, এখানে প্রতিদিন দুই থেকে আড়াইশ রোগী ডায়ালাইসিস সেবা নেন। কিন্তু হাসপাতালের কাছে কিছু টাকা বকেয়া থাকায় আদায়ের কৌশল হিসাবে সেবা বন্ধ করে দেয় সেন্ডর। শুনছি ২৩ কোটি টাকার মতো বকেয়া রয়েছে। তবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়েরও উচিত নির্বিঘ্ন সেবা দিতে চেষ্টা করা।
এ বিষয়ে হাসপাতালটির পরিচালক অধ্যাপক ডা. মিজানুর রহমান বলেন, সেন্ডর নামের কোম্পানিটি দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালে এ কাজ করে আসছে। কিছু টাকা বকেয়া থাকায় আজ সকাল থেকে ৬০০ রোগীকে তারা জিম্মি করেছে। কোম্পানিটির ওপর আমরাও বিরক্ত। তবে আশা করি দ্রুত সমাধান হবে।
সূত্র জানায়, দেশে কিডনি রোগের সবচেয়ে বড় এ বিশেষায়িত হাসপাতালে একজন রোগীর একবার ডায়ালাইসিস নিতে ২ হাজার ৭০০ টাকা খরচ হয়। এর মধ্যে রোগীর কাছ থেকে নেওয়া হয় ৫১০ টাকা। বাকি টাকা হাসপাতাল বহন করে। প্রতিদিন এখানে দুইশ থেকে আড়াইশ রোগীর ডায়ালাইসিস করা যায়।
চমেকে বিক্ষোভ : চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দিনভর ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে ডায়ালাইসিস নির্ভর কিডনি রোগীদের। ভারতীয় প্রতিষ্ঠান সেন্ডর বকেয়া পাওনার জন্য কোনো ধরনের ঘোষণা ছাড়াই তাদের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। ফলে সেবা না পেয়ে বিপাকে পড়েন শত শত রোগী।
সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত প্রায় ৮ ঘণ্টা ডায়ালাইসিস বন্ধ থাকায় রোগী ও তাদের স্বজনরা বিক্ষোভ করেন। ডায়ালাইসিস সেবা না পেয়ে অনেকে কান্নায় বুক ভাসান।
বিকালে মুমূর্ষু অনেক রোগীর শ্বাসকষ্টের সমস্যা দেখা দিলে তাৎক্ষণিকভাবে তাদের চমেক হাসপাতালে ডায়ালাইসিস করা হয়। পরে টাকা পাওয়ার আশ্বাস পেলে ডায়ালাইসিস শুরু করে সেন্ডর।
জানতে চাইলে চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. শামীম আহসান বলেন, ‘বকেয়া টাকার জন্য সাময়িকভাবে সেন্ডর তাদের সেবা বন্ধ রেখেছিল।
বিষয়টি নিয়ে ঢাকায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছি। দু-এক দিনের মধ্যে বকেয়া টাকা পাওয়ার আশ্বাস দেওয়ায় পুনরায় তারা সেবা চালু করেছে।
যুগান্তর