করোনাভাইরাস নিয়ে সতর্কতা বার্তা দেওয়া সেই চিকিৎসক লি ওয়েনলিয়াংয়ের মৃত্যুতে গত বৃহস্পতিবার থেকে চীনের লোকেরা যেভাবে শোক এবং ক্ষোভ প্রকাশ করছেন, তা আগে কখনো দেখা যায়নি। কিন্তু এই ভাইরাস নিয়ে আরও একজন সত্য প্রকাশকারীকে ‘চুপ’ করিয়ে দেওয়ার খবর তাঁরা সামান্যই জানেন। চেন কিউশি নামের ওই নাগরিক সাংবাদিক বৃহস্পতিবার থেকে নিখোঁজ রয়েছেন। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার কেন্দ্রস্থল উহান থেকে তিনি সমালোচনামূলক প্রতিবেদন করছিলেন।
৩৪ বছর বয়সী চিকিৎসক লি ওয়েনলিং যখন করোনাভাইরাসের ঝুঁকির কথা জানানোর চেষ্টা করেছিলেন, তখন পুলিশ তাঁকে ‘গুজব ছড়ানোর’ অভিযোগে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। তিরস্কারপত্রে স্বাক্ষর নিয়েছে। পরে তিনি এই ভাইরাসের সংক্রমণের শিকার রোগীদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে নিজেই আক্রান্ত হন। লির মৃত্যুর পর থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার ঝড় বয়ে যাচ্ছে। চীনের কঠোর নিয়ন্ত্রিত অনলাইনে এ ধরনের সমালোচনা বিরল ঘটনা। এখন চীনের হাজারো মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের বাক্স্বাধীনতার দাবি তুলেছেন। ‘আমি বাক্স্বাধীনতা চাই’ এমন হ্যাশট্যাগ দিয়ে মানুষ সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানাচ্ছে।
লির মতো ৩৪ বছর বয়সী নিখোঁজ সাংবাদিক চেনও চীনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বাসিন্দা। তাঁর পরিবার এবং বন্ধুরা পরে জেনেছেন, তাঁকে কোয়ারান্টাইন করার নামে আটক রেখেছে পুলিশ। চেনের মুক্তির দাবিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম উইবোতে আবেদন জানিয়েছেন অনেকেই। একজন লিখেছেন, তিনি আশা করছেন, চেন কিউশির সঙ্গে সরকার ভালো ও যথাযথ আচরণ করবে। আরেকজন লিখেছেন, ‘আমরা আরেকটি লি ওয়েনলিংয়ের মতো ঘটনার ভার বহন করতে পারব না।’
করোনাভাইরাস ঠেকাতে উহানে যাতায়াতের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের এক দিন পর গত ২৪ জানুয়ারি চেন কিউশি সেখানে যান। তিনি সেখানকার ভিড়ে ঠাসা হাসপাতাল, মৃতদেহের সৎকারকারী প্রতিষ্ঠান, অস্থায়ীভাবে তৈরি বিচ্ছিন্ন করে রাখা ওয়ার্ড পরিদর্শন করেন। নিজের চোখে দেখা এসব জায়গার ভিডিও তিনি অনলাইনে আপলোড করেন। এর মাধ্যমে সমস্যার কেন্দ্রবিন্দু উহানের বিপর্যস্ত অবস্থা সম্পর্কে বিশ্বের মানুষ জানতে পারে।
চেনের বন্ধুরা জানান, কর্তৃপক্ষ তাঁকে ধরে নিয়ে যেতে পারে—এই আশঙ্কায় তাঁরা দিনে কয়েকবার করে চেনের খোঁজ নিচ্ছিলেন। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে চেনের সাড়া না পেয়ে তাঁরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন।
চেনের একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু শুক্রবার তাঁর মায়ের ভিডিও আপলোড করেন, যেখানে বলা হয়, চেন নিখোঁজ। শুক্রবার সন্ধ্যায় ইউটিউবে লাইভে এসে চেনের মা অভিযোগ করেন, তাঁর ছেলেকে জোর করে কোয়ারান্টাইনে রাখা হয়েছে। কয়েক ঘণ্টা আগে কুইংডাওয়ের জননিরাপত্তা কর্মকর্তা এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তা তাঁদের জানিয়েছেন, চেনকে ইতিমধ্যেই কোয়ারান্টাইনের নামে আটক করা হয়েছে। কখন তাঁকে আটক করে কোথায় রাখা হয়েছে, এ বিষয়ে চেনের মা–বাবা জানতে চাইলেও তাঁরা কিছু জানাননি।
চেনকে ‘চুপ’ করিয়ে দেওয়ার ঘটনা এটাই প্রথম নয়। গত আগস্টে তিনি হংকংয়ে গিয়ে সেখানকার গণতন্ত্রকামী বিক্ষোভ নিয়ে প্রতিবেদন করেন। উইবোতে তাঁর ভিডিও প্রতিবেদনে তিনি চীনের রাষ্ট্রীয় ভাষ্যকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বলেন, বিক্ষোভকারীরা ‘দাঙ্গাকারী ও বিচ্ছিন্নতাবাদী’ নন। তাঁদের বেশির ভাগই শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভে যুক্ত হয়েছেন। বেইজিং থেকে কর্তৃপক্ষের ডাক পেয়ে চেনের হংকং সফর শেষ হয়। চীনের মূল ভূখণ্ডে ফেরার পর সরকারের বিভিন্ন সংস্থা তাঁকে বারবার জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য ডাকে বলে তিনি পরে আরেকটি ভিডিওতে উল্লেখ করেন। এরপর চীনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর সবগুলো অ্যাকাউন্ট মুছে ফেলা হয়। সাড়ে সাত লাখ অনুসারীসহ উইবো অ্যাকাউন্ট এবং আগে পোস্ট করা সব ভিডিও হারাতে হয় তাঁকে। খবর সিএনএন