আসিফ ইকবাল : শিগগিরই দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা ডাক্তার ঘাটতির যুগ থেকে ডাক্তার বাড়তির যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছে। কিন্তু এতকিছুর পরেও আমাদের দেশী নাগরিকদের স্বাস্থ্যসেবার জন্যে বিদেশমুখীতা দিন দিন না কমে বেড়েই চলেছে। এসব প্রসঙ্গে কথা উঠলেই আমরা অনেক যুক্তিযুক্ত কমেন্ট গ্রুপে দেখতে পাই। সেসব যুক্তির বাইরে গিয়ে আমি আমার অল্পসল্প অবজারভেশনের প্রেক্ষিতে কিছু কথা বলতে চাই।
বিদেশমুখীতার কারণের কথা উঠলে আমাদের ডাক্তার ভাইয়েরা সরকারী স্বাস্থ্যসেবার বিভিন্ন ভালদিক তুলে ধরে বিদেশমুখী প্রবণতা কমাতে চেষ্টা করেন। যদিও বাস্তবতা হচ্ছে সরকারী মেডিকেলের সেবাগ্রহীতা শ্রেণীই আলাদা,তারা সহজে বিদেশ যায় না বা যেতে পারে না।বিদেশ যাওয়া শ্রেণীর ম্যাক্সিমামই বেসরকারি হাসপাতালের ভোক্তা। কাজেই আমি এ লেখায় তাদের নিয়েই আলোচনা করব।
অনেকে আবার বলতে চেষ্টা করেন( এরা বেশির ভাগ নন ডাক্তার) আমাদের দেশে বেসরকারি হসপিটালের চিকিৎসা খরচ অনেক বেশি, তাই রোগীরা বিদেশমুখী হচ্ছে। আমার মতে,সমস্যা কখনোই টাকা ময়,সমস্যা হলো টাকার বিনিময়ে প্রাপ্ত সেবা।
মানলাম,আমাদের স্যারদের ক্লিনিক্যাল স্কিল কারো চেয়ে কম না,কিন্তু একটা হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা কী শুধুমাত্র তার ডাক্তারদের কোয়ালিটির উপর নির্ভরশীল? উত্তর হলো- না। সেবা আরো নির্ভর করে – ডায়াগনস্টিক রিপোর্ট,রোগ অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট রেফারেল সিস্টেম নার্স এবং সাপোর্টিং স্টাফদের সার্ভিস, প্রদত্ত বিলের বিপরীতে প্রাপ্ত সার্ভিসের রেশিও এসব ফ্যাক্টরের উপর। এসব ফ্যাক্টরে আমাদের বেসরকারী হাসপাতালগুলোকে যারা ডিফেন্ড করতে আসবেন,তাদেরকে শুধু বলব, ডাক্তার হিসেবে না,একজন রোগী কিংবা রোগীর স্বজন হিসেবে এদেশের যেকোন নামি-দামি হাসপাতাল ঘুরে আসুন- তারপর ডিফেন্ড কইরেন। বেশি কথা বলব না, শুধু একটা কথা বলি,আমাদের ডাক্তারদের মধ্যে যারা সিরিয়াস কোন ক্রনিক রোগে আক্রান্ত হন, তাদের অন্তত ৯০% কোন না কোন সময় বিদেশ থেকে ঘুরে আসেন। বাস্তব উদাহরণ দেই,আমাদের এক ডাক্তার বন্ধু তার নাকের টিউমারের জন্যে কুমিল্লা এবং বিএসএমএমইউতে ২ দফা সার্জারি এবং বায়োপসির পরেও recurr করায় এবং সুনির্দিষ্ট ডায়গনোসিস না হওয়ায় শেষপর্যন্ত মুম্বাই যায় এবং বর্তমানে ডায়গনোসড এবং খুশি আছে। এখানে আমি আমাদের স্যারদের বিন্দুমাত্র দোষ দেখছি না,কিন্তু এটা তো সত্য রোগীরা এভাবেই বিদেশমুখী হচ্ছে। আপনি যদি বলেন,কোন সমস্যাই নাই- তাহলে সমস্যার সমাধান হবে কীভাবে??
আরেকটা কথা বলি,স্কুলজীবনে একটা সময়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কাটিয়েছি,তখন দেখতাম সীমান্তের ওপারে ত্রিপুরা থেকে প্রেগন্যান্ট মহিলারা সেখানকার ক্লিনিকে আসত সিজার করাতে। এমনটাই তো হবার কথা,ত্রিপুরা ভারতের পিছিয়ে থাকা রাজ্যের একটি,অন্যদিকে কুমিল্লা-বিবাড়িয়া রাজধানী ঢাকার তুলনামূলক কাছে হওয়ায় এখানে চিকিৎসা সেবা ভাল হবে ঃ ত্রিপুরা থেকে রোগীরা কুমিল্লায় আসবে,আসাম থেকে সিলেট আসবে- এমনটাই তো হবার কথা ছিলো। অথচ এখন শুনছি- সেই ত্রিপুরা বাংলাদেশীদের টার্গেট করে ভালো বেসরকারী হাসপাতাল বানাচ্ছে- এডভারটাইজ করছে৷ যে নেপালের বেশিরভাগ ডাক্তার বাংলাদেশের বানানো,সেখানেও বাংলাদেশের রোগীরা যাচ্ছে চিকিৎসা নিতে।
সমস্যার সমাধান অসম্ভব নয়,কিন্তু তার আগে সমস্যাটাকে স্বীকার করুন।ডায়াগনস্টিক সাপোর্টে পিছিয়ে থাকার কথা স্বীকার করুন- সমাধান খুঁজুন। হেলথ টুরিজম সরকারি হাসপাতালের কাজ নয়, রোগীদের বিদেশমুখীতা সরকারী হাসপাতালের ব্যর্থতা নয়। কাকে কখন ডিফেন্ড করবেন সেটা বুঝুন।
আর সবচে বড় কথা,নিজের দেশে হেলথ টুরিজম গড়ে তুলুন,ত্রিপুরাকে টার্গেট করুন,আসামকে করুন। ডাক্তার পর্যাপ্ত আছে,তাদের কাজে লাগান। ভালো মানের বেসরকারি হাসপাতাল গড়ে তুলুন।টাকা নিন, তবে টাকার বিনিময়ে ন্যায্য সার্ভিস দিন। আপনি কোন জমিদার নন, রোগীরা আপনার প্রজা নয়,আপনার প্রতি অনুগত থাকতে সে বাধ্য নয়। পৃথিবীটা এখন খুব ছোট,যাদের মানুষ টানার ক্ষমতা আছে-(সে সেবা দিয়েই হোক আর প্রচারণা দিয়েই হোক) মানুষ তাদের কাছেই যাবে।