তখন স্কুলে পড়ি। আমার বড় চাচার বাসায় দিনাজপুর থেকে আসা একজন সদ্য তরুনী গৃহকর্মী ছিলেন। নাম বানু। খুবই সুন্দরী। দিনাজপুর থেকে চাঁদপুর । সে সময়ে যোজন যোজন দূর। তো একদিন হটাৎ করে তার শুরু হলো খিঁচুনি । কয়েকজন মিলেও তাকে স্থির রাখা যেতনা। দীর্ঘ সময় এরকম করার পর একসময় নিস্তেজ হয়ে যেত। পরদিন আবার কাজ কর্ম শুরু । এভাবে বার বার হতে থাকলো। ঝাড়-ফুঁক, গৃহর্কত্রী কর্তৃক ছাগল মানত সাথে টুক টাক ঔষধ……। কোন লাভ হলনা। অবশেষে এগিয়ে এলো এলাকার এক রিক্সা চালক। জানা গেল ইতিহাস। বানু সে রিক্সা চালকের গভীর প্রেমে পড়েছে। কিন্তু ভয়ে তাঁর মালকিন খালাম্মাকে বলতে পারছিলনা আবার প্রেমের আহবানকেও উপেক্ষা করতে নারাজ। অবশেষে বিয়ে দেয়া হল। বানু চলে গেল সংসার করতে। তাঁর আর কখনো এই উথাল পাথাল খিঁচুনী হয়নি। কারন তার কনফ্লিক্ট এর যথাযথ সমাধান হয়েছিল। এখনো বাড়ী গেলে বানু আসে দেখা করতে। সে ইতোমধ্যে নানী-দাদী দুটোই হয়েছে।
এম বি বি এস পড়াকালীন বুঝলাম বানু ছিল ‘হিস্টেরিয়া’ র’ রুগী। সাইকিয়াট্রিতে এম ডি কোর্সে এসে জানলাম এটাকে বলে কনভার্শান ডিজঅর্ডার (Conversion Disorder)।
অন্য নাম Functional Neurological Symptom Disorder. নাম থেকেই বুঝা যাচ্ছে এখানে কিছু রূপান্তরিত হচ্ছে। মনের সচেতন/ অবচেতন কোন চাপ, দ্বিধা-দ্বন্দ অথবা কনফ্লিক্ট যাই বলিনা কেন তা রূপান্তরিত হচ্ছে শারীরিক লক্ষন অথবা বিভিন্ন অস্বভাবিক আচরনে।
ইতিহাসঃ এটি হিস্টেরিয়া হিসেবে সর্বাধিক পরিচিত। প্রাচীন গ্রীসের চিকিৎসা বিজ্ঞান বইয়েও শব্দটি আছে। কারন সে সময়ে ধারনা করা হত যে এটি জরায়ুর অবস্থান বা জরায়ুর কাজের বিঘ্ন ঘটায় হয় ( যেহেতু মেয়েদের এ সমস্যা বেশী হতো)। সতের শতক পর্যন্ত এ ধারনা জনপ্রিয় ছিল। ঊনিশ শতকে ফ্রেন্স নিউরোলজিস্ট Charcot প্রথমবারের মত বলেন যে এটি ব্রেইনের কার্যক্রমের সাথে সর্ম্পকিত। পরবর্তিতে Sigmund freud “Conversion” শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন। তিনি এবং তাঁর কলিগ Breuer আবেগের সাথে কনর্ভাশন ডিজঅর্ডারের সর্ম্পক ব্যখ্যা করেন।
কখন আমরা কনর্ভাশন ডিজঅর্ডার বলবো? এ সর্ম্পকে
DSM-5(Diagnostic and Statistical manual of Mental Disorders, 5th edition) এ বলা আছে
1. One or more symptoms of altered voluntary motor or sensory function
2. Clinical findings provide evidence of incompatibility between the symptoms and recognized neurological or medical conditions.
3. The symptom or deficit is not better explained by another medical or mental disorder.
4. The symptom or deficit causes clinically significant distress or impairment in social, occupational or other or other important areas of functioning or warrants medical evaluation.
লক্ষণগুলো কি হতে পারে?
Motor- Involuntary movement, tics, blepharospasm, torticolis, opisthotonos ,seizure,abnormal gait, falling, astasia-abasia, paralysis, weakness, aphonia.
Sensory deficits-Anaesthesia, specially of extremities,midline anaesthesia, tunnel vision, deafness
Visceral symptom-Psychogenic vomiting, pseudocyesis, globus hystericus, swooning or syncope,urinary retention, diarrhoea.
শিশুদের ক্ষেত্রে –বাড়তি থাকতে পারে-Enuresis, masturbation, migraine, nervous cough ,pain ইত্যাদি।
কারো কারো ক্ষেত্রে মিশ্র লক্ষন ও থাকতে পারে।
Comorbidity: সাথে থাকতে পারে Deressive Disorder, Anxiety Disorder, Somatizazation Disorder
Personality Disorder-specially with Historionic type (5-21%) and The Passive-dependent type (9-40%).
স্থায়িত্বঃ
১।তাৎক্ষনিক/স্বল্পকালীন( Acute) –লক্ষণগুলো ৬ মাসের কম থাকবে।
২।স্থায়ী/ দীর্ঘ মেয়াদী( Persistent)- লক্ষন বা লক্ষনসমূহ ৬ মাস ব তার বেশী দিন থাকবে।
সাথে সাইকোলজিক্যাল স্ট্রেসর থাকতে পারে আবার নাও থাকতে পারে।
কনর্ভাশন ডিজঅর্ডার সাধারণত কোন যথাযথ শারীরিক সমস্যা অথবা রোগাক্রান্ত অবস্থার প্রতিফলন নয়। এক্ষেত্রে রোগীরা সাজেশনে এবং অন্যদের বিশেষ করে চিকিৎসকের মন্তব্যে খুবই সাড়া দেয়। তবে ঘন ঘন চিকিৎসকের কাছে নেয়া, সব কাজে সাহায্য করা( যেমন হাটতে, খাওয়াতে, হুইল চেয়ার দেয়া ,অনেক বেশি মনোযোগ দেয়া ইত্যাদি) – Reinforcer হিসেবে কাজ করে।
তবে আশ্চর্য্যজনক বিষয় হচ্ছে রোগী তার লক্ষন সর্ম্পকে সচেতন থাকেন না (‘la belle indifference’)।
কনর্ভাশন ডিজঅর্ডারের সাইকোএনালআইটিক থিওরি অনুযায়ী এখানে রোগীর দুটো প্রাপ্তি আছে, যা বইয়ের ভাষায়- প্রাথমিক অর্জন/ প্রাপ্তি ( Primary Gain)-তার ভেতরে সৃষ্ট কষ্ট, চাপ, যাতনা,অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি ইত্যাদি থেকে সাময়িক মুক্তি পাওয়া।
পরবর্তী অর্জন /প্রাপ্তি (Secondary gain)-এটি কনর্ভশন ডিজঅর্ডারে খুব বেশী দেখা যায়। এগুলো সরাসরি জাগতিক সুযোগ সুবিধা প্রাপ্তি অথবা দায়িত্ব এড়াতে পারা ( যেমন অনেক উপহার পাওয়া, বাড়তি মনোযোগ পাওয়া কিংবা কাজ থেকে অব্যাহতি ,জটিল পরিস্থিতি এড়ানো বা পড়া না লাগা, স্কুলে যেতে হলনা ইত্যাদি)। তবে মনে রাখা প্রয়োজন এসব কম হলেও অন্যান্য মানসিক ও শারীরিক রোগেও দেখা যেতে পারে।
রোগ বিস্তার(Epidemiology): দেশ ভেদে এর হার সাধারন মানুষের মধ্যে ১১-৩০০ /১০০০০০ হতে পারে। বিভিন্ন গবেষনায় দেখা গিয়েছে জেনারেল হাসপাতালের রোগীদের মধ্যে যারা মানসিক রোগের বিষয়ে পরামর্শ নিতে আসেন তাদের মধ্যে ৫-১৫% কনভার্শন ডিজঅর্ডারে ভুগছেন।প্রাপ্ত বয়স্কদের মধ্যে নারী-পুরুষ অনুপাতটি ২ঃ১, তবে তা কখনো আরও বেশী(১০ঃ১) হতে পারে। শিশুদের বেলায় ও মেয়ে শিশুদের মধ্যে বেশি হয়। মহিলাদের ক্ষেত্রে লক্ষণগুলো শরীরের বাম পাশে বেশি দেখা যায়। সাধারনত; দশ বছরের পূর্বে এবং পয়ঁত্রিশ পরে কম হয়। পশ্চাদপদ জনগোষ্ঠী অর্থাৎ গ্রামীন ,স্বল্প শিক্ষিত, অর্থনৈতিকভাবে দূর্বলদের মধ্যে বেশি দেখা যায়।
কারনঃ সাইকিয়াট্রিক আর দশটা রোগের মতই এ রোগের সুনির্দিষ্ট একক কোন কারন নেই।
সম্ভাব্য কারন সমূহ-
নিজের ভেতরের অপ্রকাশিত/অবচেতন চাপ শারীরিক লক্ষনের মাধ্যমে কমানো।
সামাজিক কারন
Biological factors: নিউরোইমাজিং এ দেখা গিয়েছে খারাপ ঘটনা, স্ট্রেস এগুলোর সাথে ব্রেইনের আবেগ এবং স্মৃতি সাথে সর্ম্পকিত অংশে ( such as Hippocampus and amygdala)পরিবর্তন আসে।
Hypometabolism of the dominant hemisphere and hyper metabolism of non dominant hemisphere and have implicated impaired hemispheric communication in the cause of conversion disorder. The symptom may be caused by an excessive cortical arousal that sets off negative feedback loops between the cerebal cortex and the brainstem reticular formation. Elevated level of corticofugal output, in turn inhibit the patient’s awareness of body sensation.
আঞ্চলিক সংস্কৃতির /বিশ্বাস- বাংলাদেশ সহ উপমহাদেশে ভুত –প্রেতের আছর খুবই সাধারন একটি (Possession state).
আরোগ্য সম্ভাবনা(Prognosis)- যদি সমস্যা অল্প মেয়াদি হয় এবং রোগির বয়স কম হয় , সুনির্দিষ্ট কারন থাকে , সেনসরি লক্ষন বেশী ,দ্রুত সঠিক ব্যবস্থাপনা হয় তবে তা সেরে যাওয়ার সম্ভাবনা ভালো( ৯৫% এর ক্ষেত্রে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার দু সপ্তাহের মধ্যে)।
কিন্তু এর উল্টোটা অর্থাৎ দীর্ঘ দিনের ইতিহাস( এক বছরের বেশি) এবং রোগের শুরুটা বেশী বয়সে,সাথে ব্যক্তিত্বজনিত সমস্যা, এ রোগের কারনে কোন আর্থিক অথব আইনগত সুবিধা প্রাপ্তির সম্ভাবনা থাকে তবে এক্ষেত্রে ফলাফল তুলনামূলকভাবে খারাপ। অর্থাৎ বার বার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
এপিডেমিক /Mass Hysteria :এটি সাধারনত ক্লোজ গ্রুপের মধ্যে হয়। যেমন স্কুলের ছাত্রীদের মধ্যে। প্রথমে একজনের মধ্যে দেখা দেয় তারপর আস্তে আস্তে অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। মাস হিস্টেরিয়ায় সাধারনত অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, মাথা ঘুরানো –এ ধরনের লক্ষন দেখা যায় এবং তা এলাকায় রীতিমত গন আতঙ্কের সৃষ্টি করে।
তাৎক্ষনিক ব্যবস্থাপনা: সাধারনত এ ধরনের রোগী মেডিসিন/ হৃদ রোগ অথবা নিউরোলজী বিভাগের জরুরী বিভাগে আসে। এদের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টি ভঙ্গী আনা জরুরী এবং সহমর্মিতা নিয়ে কাজ শুরু করতে হবে।
১।প্রথমে রোগী( সম্ভব হলে) এবং সাথের নির্ভরযোগ্য লোক থেকে তাঁর শারীরিক ও মানসিক রোগের ইতিহাস নিতে হবে।
২।প্রয়োজনীয় পরীক্ষার ব্যবস্থা।
৩।রোগী এবং তাঁর সাথে আসা পরিবারের সদস্য/ লোকজনকে সাহস যোগানো এবং আশ্বস্ত করা।
৪। তাদের আবারো আশ্বস্ত করুন- লক্ষণগুলো সাময়িক এবং তাঁর মনের অবচেতন /অপ্রকাশিত কষ্ট/ ক্ষোভ কিংবা বেদনার শারিরিক বহিঃপ্রকাশ।
৫। রোগীর লক্ষনগুলোর প্রতি বাড়তি মনোযোগ সরিয়ে নিন বা যে কাজে ( Reinforcement) রোগীর এ আচরণগুলো উৎসাহিত হবে তা পরিহার করুন।
৬।সাইকিয়াট্রি বিভাগে রেফার করুন।
৬। মূল কারণটি চিহ্নিত করা ( Psychological / social factor) এবং সেটির উপর কাজ করা।
৭।প্রয়োজনে ঔষধ দেয়া হয় তবে তা রোগীর বয়স, লক্ষন ও অন্যান্য বিষয় বিবেচনা করে।
৮। অন্য কোন শারীরিক /মানসিক রোগ থাকলে সেসবের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা।
উপসংহারে বলতে চাই কনর্ভাশন ডিজঅর্ডারের রোগীর আচরণকে ATTENTION SEEKING BEHAVIOUR না ভেবে HELP SEEKING BEHAVIOUR হিসেবে বিবেচনা করুন।
Dr. Shahana Parveen Poly
Asst.Professor, Psychiatry, NIMH
1st batch, SZMC(Session1991-92)